Logo
logo

গল্প / কাহিনী

গল্প - শেষের আলপনা



আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল সুরমা দেবীর। গায়ে হাউসকোটটা জড়িয়ে, ধীর পায়ে খোলা জানালার কাছে বহুদিন পর এসে দাঁড়ালেন তিনি। সকালের এই সদ্য ফোটা আলো, ঝকঝকে নীল আকাশ তাঁকে বড্ড টানে। এক অদ্ভুত সুগন্ধ তিনি পান এই সময়টাতে, যা তাঁর বড্ড প্রিয়। সেই ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি, একইভাবে।
নাক টেনে বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে আজও তিনি সেই সুগন্ধ নিলেন -- ভোরের সুগন্ধ, তাজা হওয়ার সুগন্ধ।
আজ নববর্ষ, পুরানো কে সরিয়ে রেখে আবার নতুন একটি বছরকে সাদরে আলিঙ্গন করার দিন আজ।
অনেকটা সময় জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে পড়েছিলেন সুরমা দেবী। এই নববর্ষ ঘিরে কত না কথা, কত না পুরনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিলো। আচমকা ভাবনাগুলোতে ছেদ পড়ল। আজকাল আর বেশিক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেই পারেন না। হাউসকোট টা সামলে তিনি ধীরে ধীরে খাটে এসে বসলেন।
নববর্ষের এই সময়টাতে যেন প্রকৃতিও বেশ খুশি খুশি থাকে। পুরনো সবকিছুকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে পা বাড়ানো, চারিদিকে আনন্দের সুর তো থাকবেই।
"ও লক্ষ্মী, ওঠ মা এবার। ভোর হলো যে--- বাসি জামা কাপড় ছেড়ে দুয়ারে দুয়ারে জল দিতে হবে। তারপর শাঁখ বাজাতে হবে।
কত কাজ বাকি পড়ে আছে যে, এক এক করে সারতে সারতেই তো বেলা গড়িয়ে যাবে। আবার, আজ কিন্তু আমাকে নিয়ে তোকে বেরোতেও হবে, সে কথা খেয়াল আছে তো রে? "
বার দুয়েক সুরমা দেবী ডাকার পরে লক্ষ্মী ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে ওঠে, "ঠাকুমা, আর একটুখানি ঘুমোতে দাও। একটু পরেই উঠছি গো।
তুমি চিন্তা করো না, আমি ঠিক সময় উঠে সব কাজ সামলে নেব।"
সুরমা দেবী আর কিছু বলেন না।
যতবার রাত্রে ওঠেন, বাথরুমে যান, লক্ষ্মী যত্ন করেই তাঁকে নিয়ে যায়। এসবের পরে মেয়েটার ওপর একটা মায়াও লাগে।
এই ভোরে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে আর ইচ্ছে হলো না।
লক্ষ্মী ও বেশ দায়িত্বশীল মেয়ে। তিনি জানেন, সে যত্ন করে, ঠিক সময়েই তার সমস্ত কাজগুলো সেরে ফেলবে।
সবই জানেন তিনি, কিন্তু, ওই অভ্যেস,
এখন বয়স
বাড়ার সাথে সাথে অভ্যেসটা কেমন ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ তাঁদের পাড়াতে নববর্ষের এক বড় অনুষ্ঠান আছে।
সবার অনুরোধ, সুরমা দেবীকে সেখানে উপস্থিত থাকতেই হবে। তিনি আজ সেই অনুষ্ঠানের স্পেশাল গেস্ট।
লক্ষ্মীর ওপরেই ভরসা, হাঁটা চলাতে আজকাল বড় অসুবিধা হয়। তাই লক্ষ্মীর হাতটাই তাঁর এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে সবথেকে বড় বল ভরসা।
"আজকাল কেন যেন যত বয়স বাড়ছে মনের ছটফটানি ও বাড়ছে বোধহয় কথায় কথায়।"--- সুরমা দেবী নিজের মনেই বলে ওঠেন।
ইদানিং, বড্ড কর্তার কথা মনে পড়ে। নববর্ষ আসলে তাঁর উদ্যোগ থাকতো বাড়িতে চোখে পড়ার মতো। ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনি, সুরমা দেবীর, এমনকি নিজের জন্যও নববর্ষের বাজার করতে ভুলতেন না তিনি। প্রত্যেকের জন্য, তাদের পছন্দমত নতুন নতুন জামা কাপড় কেনা, সবাইকে উপহার দেওয়া, সে ছিল বটে, এক মহানন্দের ব্যাপার।
কি যে হইচই করে কাটতো নববর্ষের বিশেষ দিনটা।
কত ধরনের রান্নাবান্না হত, রান্নাঘর ম্ ম্ করত সুন্দর গন্ধে। বেশ খাদ্য রসিক মানুষও ছিলেন তাঁর কর্তা। নিজে যেমন খেতে ভালোবাসতেন,অন্যকে খাওয়াতেও জুড়ি মেলা ছিল ভার।
তিনিও গেছেন, আর সব চুকেবুকে গেছে। "বাজনাও নেই, বাদ্যি ও নেই।"
এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অজান্তেই।
বাবা চলে যাওয়ার পর ছেলে নীহার মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
ছেলে - বৌমার ব্যস্ত সংসারে তিনি নিজেকে নতুন করে আর নিয়োজিত করতে চাননি। তাঁর নিজের হাতে গড়ে তোলা সংসারটা আজও তাঁর বড্ড প্রিয়। যে রাজ্যপাট একান্তই তাঁর নিজস্ব, সেখান থেকে অনুভূতিগুলোকে, স্মৃতিগুলোকে নিয়ে স্থানান্তরিত করতে একটুও মন সায় দেয়নি সেদিন। তাই সেদিনের পর থেকে লক্ষ্মীই সহায়।
এইসব ভাবনার মাঝেই তাঁর দুই চোখে আবার কখন ঘুম জড়িয়ে আসে।
"ঠাকুমা, ও ঠাকুমা, ওঠো গো তাড়াতাড়ি। কত বেলা হয়ে গেল।" লক্ষ্মীর ডাকে ধড়মড়িয়ে ওঠেন তিনি।
কিন্তু এখন ঘুমটা ভাঙতে মনটা তাঁর বড্ড খারাপ লাগছে।
কিন্তু কেন এত খারাপ লাগছে?
পুরনো দিনগুলোর কথা, নানা ভাবনা নিয়ে ঘুমিয়ে পরার পর সেই ঘুম ভাঙলে কি এরকম মন খারাপ হয়?
তিনি যেন
সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না। কিন্তু, মনটা অদ্ভুতভাবে বিষন্ন লাগছে।
তাড়াতাড়ি পুজো সেরে জলখাবার খেয়ে তিনি তৈরি হতে শুরু করলেন।
কিন্তু সকাল থেকেই মনটা তাঁর এক অদ্ভুত আচরণ করে চলেছে।
কি যে ছাই হচ্ছে মনের মধ্যে, কিছুতেই বুঝতে পারছেন না তিনি। এরকম তাঁর আজকাল মাঝে মাঝেই হয়।
তিনি বুঝতে পারেন না এক এক সময় যে এটা কি মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করা নানা ধরনের চিন্তার ফলে ঘটা কোন বয়স জনিত উত্তেজনা? নাকি, মনের কোন শূন্যতা থেকে আসছে?
কিন্তু কেন?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তিনি তো একজন সুখী স্ত্রী, সুখী মা, পরিপূর্ণ গৃহিণী। তাছাড়াও তাঁর একটা অন্য পরিচয়ও আছে-- তিনি একজন প্রথিতযশা আলপনা শিল্পী। তাঁর আলপনা কথা বলে, সুর তোলে। সেই আলপনায় মনের মাধুরী মিশে থাকে। হৃদয় ও চোখ সরতে চায় না সেই আলপনার অপূর্ব কারুকার্য থেকে। তিনি শিল্পী, তাঁর শিল্প লোকের কাছেও মনোগ্রাহী।
তবে আজ কয়েক বছর তিনি তাঁর এই শিল্প থেকে দূরে রয়েছেন-- বয়স জনিত ও শারীরিক নানাবিধ কারণে।
আজ আবার নতুন করে তাঁর ডাক এসেছে তাঁরই পাড়াতে। প্রতিবছর এই পাড়াতে খুব জাঁকজমক করে নববর্ষ পালন করা হয়। অনেক বিখ্যাত শিল্পীরাও আসেন।
আজ এই নববর্ষ পূর্তি ২৫ বছরে পা রাখল, তাই সেখানে আজ তাঁর আমন্ত্রণ। তাঁকে সম্মান জানানো হবে।
তাই এই বিষন্নতার মাঝেও মনটা কোথায় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে মাঝেমধ্যে ভরে উঠছে। মনের কোনে লুকিয়ে থাকা কিছু ভালো উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ, নিজের প্রতি এক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ কে সামনে তুলে আনছে মাঝে মাঝেই।
আজ তিনি অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য কর্তার দেওয়া শেষ নববর্ষের শাড়িটা, বড় পছন্দের, বড় প্রিয় এই চওড়া পারের শাড়িটা, তিনি আজ বেছে নিলেন পরার জন্য।
যথাসময়ে তিনি অনুষ্ঠানে পৌঁছলেন। সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অনুরোধ করা হলো যে, তাঁর মত গুণী ও বয়স্ক শিল্পীকে এইবারের নববর্ষের অনুষ্ঠানে সম্মানিত করতে পেরে, এবং তিনি যে উপস্থিত থেকে তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, তাঁকে আজ নিজেদের মধ্যে পেয়ে সবাই খুব গর্বিত ও আনন্দিত।
তাই আজ সকলের আবদার, তাঁর সৃষ্টিকে আরও একবার ফিরে দেখা হোক এই দিনে। এই বছরে, নববর্ষের আজকের দিনে ঘিরে থাকুক তার আঁকা, আলপনার নকশায়।
সুরমা দেবী প্রথমে একটু আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারণ, আজকাল তাঁর বয়স বাড়ছে, হাত কাঁপে। পারবেন কি সেই আগের মত আলপনায় মনের সৃষ্টিকে ঢেলে দিতে, সেই সুর তুলতে?
কিন্তু তাঁকে আশ্বাস দেয়া হলো যে, তিনি ঠিক পারবেন এবং সাথে তিনি আরো দুজন সহকারী পাচ্ছেন, তাঁকে সব রকমের সাহায্য করার জন্য। সুতরাং, তাঁর কোন অসুবিধাই হবে না।
সবার অনুরোধ ও উপরোধে এবং সাহায্যকারীদের সাহায্যের আশ্বাসে তিনি সবার ভালোবাসার আবদারকে এই দিনে কোন মতেই ফেরাতে পারলেন না।
বিকেলে আবার আসবেন এই কথা দিয়ে তিনি লক্ষ্মীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। গুণীজনদের উপস্থিতিতে আসল অনুষ্ঠানটি সেই সময়েই।
সারাটা দুপুর তিনি ছটফট করে চললেন। ভাবতে লাগলেন,
আলপনার কোন নকশায় তিনি জীবনের ছবি আঁকবেন, সুর তুলবেন?
এদিকে লক্ষ্মী কিন্তু খুব খুশি, ঠাকুমা আবারও আঁকবে।
সে শুধু তার ঠাকুমাকে বলে চলেছে, "আমি আছি, তোমার পাশে। তুমি শুধু ভাবো, তুমি কি আঁকবে?
আগের মতো কিভাবে তোমার আলপনায় সবাইকে অবাক করে দেবে।"
এত চিন্তার মাঝেও লক্ষ্মীর কথাগুলো শুনে সুরমা দেবী না হেসে পারেন না।
মনের গভীরে এক অদ্ভুত বিশ্বাস, অনুভূতির সাথে জড়ানো লক্ষ্মীর এ এক দৃঢ় আত্মবিশ্বাস-- তার ঠাকুমা পারবেই।
ছেলে, বৌমা, নাতি-নাতনী ও ক্রমাগত ফোনে সাহস জুগিয়ে চলেছে।
ঠিক বিকেল পাঁচটায় তিনি রওনা দিলেন লক্ষ্মীর সাথে অনুষ্ঠান আসরের উদ্দেশ্যে।
আকাশটাও যেন এখনো সূয্যি মামার সাথে খুশির গল্পে মগ্ন। তার বিকিরণে প্রকৃতিও যেন গদগদ। আর এই মুহূর্তে সুরমা দেবীর মন ও আজ এক আনন্দের অনুভূতি ও উত্তেজনায় মাখামাখি।
উদ্যোক্তারা তৈরিই ছিলেন। তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানো হলো প্রথমেই।
প্রয়োজনীয় সামগ্রী সাজিয়ে নিয়ে বসলেন তিনি মনকে শান্ত করে। জানালেন পাশে থাকা সাহায্যকারীদের, প্রয়োজনে তিনি তাদের সাহায্য নেবেন।
এই মুহূর্তে সুরমা দেবী অদ্ভুত শান্ত, ধীর স্থির। আত্মবিশ্বাসের প্রত্যয় তাঁর চোখে মুখে। পরিবেশও যেন বন্ধুত্ব পাতিয়েছে আজ এই মানুষটির সাথে এই মুহূর্তকালীন সময়েই।
তিনি শুরু করলেন তাঁর সৃষ্টিকে।
তাঁর সৃষ্টি প্রকাশিত হয়ে মেলে ধরতে শুরু করল নিজস্ব মনের ভাবকে।
ধীরে ধীরে বিস্তার হতে লাগলো মনের কথাগুলো।
তিনি প্রথমে আলপনা শুরু করলেন তাঁর একটি আলোকিতময় সুন্দর জীবনের সূচনা দিয়ে।
যেখানে জীবন ছিল ব্যস্ত সময় দিয়ে ঘেরা, জড়ানো।
তারপর ধীরে ধীরে তিনি আঁকলেন জীবনের সেই সময়কে, যেখানে ফাঁকা সময়, নিস্তব্ধ কক্ষ, আর অব্যক্ত শূন্যতা ঘিরে এক নিঃসঙ্গতা তৈরি করেছিল একাকীত্বকে।
যা হয়ে উঠেছিল একসময় তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গী।
তারপরে তিনি প্রকাশ করলেন সেই একাকীত্বকে এক আত্ম- আবিস্কারক হিসেবে। যেখানে দেখালেন তিনি, এ শুধু একা থাকার একাকীত্ব নয়, এ এক আত্মরূপ।
জীবনের এক পরিণত সত্য, যেখানে কখনো কখনো থাকে নীরবতা, নিঃসঙ্গতা।
কিন্তু কোন এক সময় সেখানে গড়ে তুলতে হয় এক দৃঢ়শক্তি।
যা এগিয়ে রাখে মনের বিশ্বাসের এক জোরালো আবেদনকে, যেখান থেকে জন্ম হয় আত্মবিশ্বাসের।
তিনি রঙে রঙে মেলালেন সেই অনুভূতিগুলোকে। তুলির স্পর্শে দাগ কেটে দেখালেন তিনি যে, তিনিও আজ ঘৃণা করেন সেই একাকীত্বকে।
যে একাকিত্বের কারাগারে একদিন তিনিও নিজেকে সম্পূর্ণ আটক করেছিলেন। যেখানে তিনি বারবার নিষ্ঠুরভাবে মুখোমুখি হয়েছিলেন নিঃসঙ্গতার। মনের আয়না তাঁকে সেদিন বারবার দেখিয়েছিল ভয়, দুর্বলতা, ও এক অসম্পূর্ণতার নগ্ন রূপকে।
যে আয়নাতে প্রতিদিন একটু একটু করে কুয়াশা জমাট বেঁধেছিল ---
একদিন হঠাৎ তলানি তে ঠেকে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ওপরে উঠে এসে কোথা দিয়ে যেন কুয়াশাময় আয়নাটাকে পরিষ্কার করে চকচকে করে তুলল।
সে বার্তা দিল, ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল -- " জেগে ওঠো, জাগো তুমি।
তোমাকেই যে জাগতে হবে নিজেকে, শুধু সঙ্গী থাকব আমি।"
কিছু নিঃসঙ্গ মুহূর্তের গভীরে যখন তিনি ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে তাঁর নিজেরই মন এক অদ্ভুতভাবে জেগে উঠলো। আত্মবিশ্বাসের দৃঢ় লাঠি, তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের মুহূর্তগুলোকে আড়াল করে, একাকী দিনগুলোর হাত ধরল। নিজেই নিজের কাঁধে ভর করে, নিজের চোখে সাহসের আলো জ্বালিয়ে তিনি নিজেকে করলেন একাকীত্ব থেকে মুক্তি।
চিরবিদায় জানালেন সেদিন তাকে।
মাঝে মাঝে বুঝতে পারেন না আজকাল, কেন সে ফিরে আসতে চায় কখনও কোনো মুহূর্তে?
কিন্তু, তিনি যে আর চান না তাকে।
তুলি যেন আজ কথা বলছে সুরমা দেবীর হাত ধরে।
চারিদিকে অদ্ভুত এক শান্ত পরিবেশ। সবার মনোযোগ, মুগ্ধতায় ভরা কৌতুহলী দৃষ্টি আজ শুধুই সুরমা দেবীর মনের কথা ঘিরে ফুটে ওঠা আল্পনায় নিমজ্জিত।
তুলির শেষ টানটা দেখালো একাকীত্ব সকলের জীবনেই বিদ্যমান, এ এক প্রাসঙ্গিক সত্য।
কিন্তু তাকে ভয় না পেয়ে তাকে জীবনের শিক্ষক হিসেবে তার কাছে শিখে নিতে হয় নিজেকে শান্ত রাখার কৌশল।
এ এক অদ্ভুত জীবনী শক্তিও, যাকে ভর করে নিজের জীবনকে কোন কোনক্ষেত্রে একটু একটু করে এগিয়েও নিয়ে যেতে হয় নতুনভাবে।
এই একাকীত্ব কে আপন করে নিজেকে চিনতে হয়, গড়তে হয়, নতুন করে ভালবাসতে হয়, আর, সেখানেই লুকিয়ে থাকে তাকে জয় করবার ও নিজেকে ভালো রাখার মূলমন্ত্র।
তাঁর সৃষ্টি আজ সম্পূর্ণ।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন সুরমা দেবী।
পরম তৃপ্তি আজ এই মুহূর্তে তাঁর চোখে মুখে ধরা পড়ছে।
আজ তিনি সত্যিই সুখী, প্রকৃত অর্থে পরিতৃপ্ত।
একটা সময় এই একাকীত্ব তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সবাই পাশে থাকলেও তিনি তাদের ভরসার হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে পারছিলেন না। এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করছিল। অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছিলেন তিনি। খুঁজে চলেছিলেন এক অজানা উত্তর, দিনের পর দিন।
আজ তিনি এই যন্ত্রনা ও তার থেকে মুক্তির উপায়, সঠিক উত্তর ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে।
তুলে ধরেছেন জীবনের এক পরম সত্যকে।
আত্মবিশ্বাস এর দৃঢ় অনুভূতির আলপনায় তিনি এঁকে রাখলেন এই একাকীত্ব থেকে মুক্তির পথকে তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, শেষ আলপনার শিল্পে, আজ এই নববর্ষের দিনে নতুন ভাবে।
লক্ষীর হাত ধরে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে চললেন বাড়ির পথে।
পেছনে কিছু মানুষ অবাক মুগ্ধ চোখে সাক্ষী থাকল সুরমা দেবীর এক অপূর্ব কলাশৈলীর, যেখানে আঁকা হয়ে থাকল এক বৃদ্ধার একাকীত্ব জয় করবার অপূর্ব এক কাহিনী, যা হয়তো আমাদের সকলের জীবনেরই এক গল্প, এক নিষ্ঠুর সত্য।
প্রতিটি আলপনার নকশায়, নানা রঙের আঁকি-বুকিতে, রং তুলির টানে যা আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই নববর্ষের শুভ দিনে, সুরমা দেবীর জীবনের এক অধ্যায়ের কাহিনী তাঁর শেষ আলপনায় বেঁচে থাকলো নতুন শুরুর এক কাহিনী হয়ে।।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com