Logo
logo

গল্প / কাহিনী

রঙের আড়ালে লুকোনো গল্প

সকালটা আজ সত্যিই অন্যরকম। হালকা রোদে মাখা নরম এক আলো, জানলার ধারে এসে চুপচাপ বসে আছে। হাওয়ায় ভেসে আসছে শিমুল-পলাশের গন্ধ—মিষ্টি, একটু কষ্টের মতো, আবার অদ্ভুত সুন্দর। দূরে কোথাও কোকিল ডেকে উঠছে, আর সেই ডাক যেন ঈশিতার বুকের ভেতরটা হালকা করে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

আজ বসন্তোৎসব।
সবাই বাইরে রঙে মেতে উঠেছে।

কিন্তু ঈশিতার ঘরের ভেতরটা আজও আগের মতোই নিঃশব্দ, ফাঁকা।

জানলার ধারে বসে সে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, কেউ কাউকে আবির মাখিয়ে দিচ্ছে, কেউ গাইছে—
“রঙে ভরো, এ মন…”
হাসির শব্দ, গানের সুর, আনন্দের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে বাইরে যেন এক উৎসবের জোয়ার।

আর ভেতরে?
শুধু একরাশ নীরবতা।

ঈশিতা চোখ বন্ধ করল। হঠাৎই মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটা সকাল। সেদিনও এমনই বসন্ত ছিল। তার মা তাকে খুব ভোরে তুলে দিয়েছিল। ছোট্ট হলুদ ফ্রক পরিয়ে, মাথায় গাঁদা ফুল গুঁজে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিল—
“দেখবি মা, বসন্ত শুধু রঙ নয়… এটা ভালোবাসার দিন, নতুন করে বাঁচার দিন।”

সেই দিনটা কত হাসি, কত আনন্দে কেটেছিল! মা হাত ধরে তাকে নিয়ে গিয়েছিল উৎসবের ভিড়ে। আবিরে ভরে গিয়েছিল তার গাল, হাসিতে ভরে উঠেছিল মন।

কিন্তু সেই মানুষটাই একদিন হঠাৎ করে চলে গেল।
কোনো বিদায় নয়, কোনো শেষ কথা নয়—শুধু এক গভীর শূন্যতা রেখে।

তারপর থেকে ঈশিতার কাছে বসন্ত মানেই একটা কষ্টের স্মৃতি।
রঙ মানেই ফিকে হয়ে যাওয়া কোনো অনুভূতি।

হঠাৎ এক ঝাপটা হাওয়া এল। টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরোনো শাড়ি উড়ে মাটিতে পড়ে গেল।

ঈশিতা ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে শাড়িটা তুলে নিল।
হলুদ রঙটা এখন একটু ম্লান, তবুও কোথাও যেন রয়ে গেছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।

সে শাড়িটার আঁচলে মুখ ছুঁইয়ে দিল।
আর ঠিক তখনই—
একটা চেনা গন্ধ তার বুকের ভেতরটা ভরে দিল।

মায়ের গন্ধ।

ঈশিতার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
মনে হলো, সময় এতটা পেরিয়ে গেলেও এই গন্ধটা বদলায়নি একটুও। যেন মা এখনও কোথাও খুব কাছে আছে।

বাইরে আবার গান ভেসে এল—
“ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল…”

ঈশিতা ধীরে ধীরে জানলার দিকে তাকাল।
মনে হলো, এই গানটা যেন শুধু তাকে ডাকছে।
বলছে—
“এভাবে নিজেকে আটকে রাখিস না… বাইরে আয়… জীবন এখনও রঙিন।”

তার বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে এল।
সে ভাবল—
মা তো কখনো চাইত না সে এমন করে নিজেকে গুটিয়ে রাখুক।
মা তো সবসময় বলত—
“যা-ই হোক, হাসতে শিখবি… বাঁচতে শিখবি।”

ঈশিতা আস্তে করে মায়ের শাড়িটা নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল—
তার চোখে জল, কিন্তু সেই জলের মধ্যেও আজ একটুখানি আলো আছে।

আজ সে একা নয়।
আজ তার সঙ্গে আছে স্মৃতি… ভালোবাসা… আর এক অদেখা শক্তি।

সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক রোদ তার মুখে এসে পড়ল।
একটা ছোট্ট ছেলে দৌড়ে এসে তার গালে একটু আবির মেখে দিল।
হেসে বলল—
“দিদি, শুভ বসন্ত!”

ঈশিতা একটু থমকে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে… খুব ধীরে… তার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল—
অনেকদিন পর।

সে আকাশের দিকে তাকালো।
নীল আকাশ, তার মাঝে উড়ছে রঙিন আবির।
মনে হল, কোথাও থেকে মা তাকিয়ে আছে…
হাসছে… আশীর্বাদ করছে।

ঈশিতা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল—
“আজ আমি কাঁদব না মা… আজ আমি বাঁচব… তোমার মত করে।”

তারপর সে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
গানের সুরে, মানুষের হাসিতে, রঙের উচ্ছ্বাসে।

আজ বসন্ত তাকে নতুন করে একটা কথা শিখিয়ে দিল—
যারা চলে যায়, তারা সত্যিই হারিয়ে যায় না…
তারা থেকে যায় আমাদের প্রতিটা অনুভবে, প্রতিটা শ্বাসে, প্রতিটা রঙে।

আর সেই রঙেই একদিন
ভেঙে যাওয়া মন আবার জোড়া লাগে…
নীরব জীবন আবার গান গাইতে শেখে…
আর একা মানুষটাও আবার বাঁচতে শেখে।

কারণ বসন্ত মানেই—
হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়,
ফিরে পাওয়ার এক নীরব প্রতিশ্রুতি।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com