গল্প : কল্পমায়া
আশির দশকের কথা। মধ্যবিত্ত পরিবার। যৌথ পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরা আর কিছু না জানুক এটা জানতো যে শনি ও রবি বিকেল বিকেল মা কাকিমা টিভি খুলে বসবেন সিনেমা দেখতে। বাবা কাকা সেদিন ঢেলে মাছ মাংস আর আনাজপাতি কিনবেন সারা সপ্তাহের জন্য। রান্না করতে করতে বেলা গড়াতেই মা কাকিমার সে কি চেঁচামেচি। ওগো! খাওয়ার পাট শেষ করে নাও। বিকেলের সিনেমা শুরু হয়ে যাবে কাজ শেষ না হতেই।
বাড়ির বাচ্চারা জানতো এই চেঁচামেচি আরো বেড়ে যায় যেদিন উত্তম কুমারের সিনেমা থাকে। মায়েরা ঝটিকা গতিতে কাজ শেষ করে বিরক্ত মুখ নিয়ে টিভির সামনে এসে বসে। কিন্তু উত্তম কুমারকে এক ঝলক দেখলেই কেমন একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে মুখে। মিলি চিরকাল একটু পাকা। সে বলতো জানিস তো সব কটা মনে মনে উত্তম কুমারকে হেব্বি ভালোবাসে। মিলির একার নয় এ ধারণা সব ছেলেমেয়েদের ছিল।
মায়েদের কাছে সবচেয়ে বড় খলনায়িকা ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। যতক্ষণ পর্দায় ততক্ষণ ভালো। সিনেমা শেষ হলেই ঘরভাঙানি। মিলি, রুমা, বরুণা, কাদম্বরী সবাই এই এক ধারণা নিয়ে বড় হয়েছে। তখন কে উত্তমকুমার, কে সুপ্রিয়া দেবী, কে গৌরি দেবী, কেউ জানেনা ওরা। মায়ের মুখের কথা আর মা কাকিমার আলোচনা আর ম্যাগাজিনের গসিপ দিয়েই চরিত্র গুলোর সঙ্গে ওদের পরিচয়।
এদের মধ্যে মিলি আর কাদম্বরীর খুব ভাব। আসলে মিলিদের বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকতো কাদম্বরী। ওদের ঘরে টিভি ছিল। কিন্তু মিলির মা গোঁ ধরে বসতেন একসঙ্গে সিনেমা দেখবেন।
মিলি আর কাদম্বরী দুজনের খুব বই পড়ার নেশা ছিল। একজন একটা বই পড়লে পরের পাঠক অবশ্যই অপরজন। আনন্দলোক ও আনন্দবাজার পত্রিকাতে প্রকাশিত সুপ্রিয়া দেবীর নানান সাক্ষাৎকার, প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এ নিয়ে ওরা আলোচনা করতো। ভালোবাসা, প্রেম কী তা মিলি বুঝতো কিন্তু কাদম্বরী ছিল একদম অন্যরকম। মিলি ছাড়া আর কারো সঙ্গে মেলামেশা করতো না তেমন। মিলির কাছে উত্তম কুমার হিরো, তার মহিলা দোষ ছিল। উনি প্রেম করার এতো নারী পেয়েছেন জীবনে যে প্রেম করাই হয়ে ওঠেনি। কাদম্বরী সহমত নয় এর সঙ্গে। যদি কারো ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা থাকে যে মহিলারা তার প্রেমে পড়ে যায় তো তার কী করার আছে?আর সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন সুযোগ সন্ধানী।নিজের দাম বাড়াতে উত্তম কুমারকে ব্যবহার করেছেন।
মিলির বক্তব্য উনি বিষয়টাকে উপভোগ করতেন। উপভোগ করতে করতে যতই বড় হিরো হন না কেন নিজের চরিত্রটাকেই অত্যন্ত দুর্বল বানিয়ে ফেলেছিলেন।
গৌরি দেবী নিজের নড়বড়ে চরিত্রের কারণে নিজেকে মহানায়কের যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেই পারেননি যদিও পারিবারিক সমর্থন তাঁর দিকেই ছিল। অশান্তি করা, যৌথ জীবনের অধিকার কায়েম করা আর একটা মানুষকে নিয়ে টানাটানি করাই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ছিল। সেদিক থেকে সুপ্রিয়া দেবী অত্যন্ত বলিষ্ঠ চরিত্রের মানুষ। ওনার ঘর ভেঙে যাওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে একা থাকতেন। একদিন হঠাৎই মহানায়ক চলে এসেছিলেন তাঁর কাছে একটু জায়গা চেয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে উত্তম কুমারের প্রতি প্রেম, ভালোবাসা ও ঠাঁই দেওয়ার মত ব্যক্তিত্ব ছিল বলেই সমাজ সংসারের তোয়াক্কা না করে দিতে পেরেছিলেন জায়গা। চরিত্র এতটাই পোক্ত ও কড়া যে তার পাশে উত্তমকুমারকেও অত্যন্ত দুর্বল ও কাপুরুষ বলে মনে হয়। উনি সুপ্রিয়া দেবীর জন্য গৌরি দেবীকে ছেড়ে আসেননি। এসেছিলেন একান্তভাবে নিজের জন্য। ওনার নিজের জায়গাটা ধরে রাখার জন্যই হয়তো মানসিক একটা অবলম্বন খুঁজেছিলেন যা তিনি পেয়েছিলেন শুধুমাত্র সুপ্রিয়া দেবীর মধ্যেই। এতটাই দুর্বল চরিত্র ছিল উত্তম বাবুর যে উনি গৌরি দেবীর সঙ্গে আজীবন সম্পর্ক রেখেছিলেন। আসলে ভালোবাসা কী সেটা সুপ্রিয়া দেবী জানতেন। উত্তমকুমার নয়। যেভাবে সুপ্রিয়া উত্তমকুমারকে ভালোবেসেছিলেন সেভাবে কোনোদিনই উত্তমকুমার ভালোবাসতে পারেননি সুপ্রিয়া দেবী কে।
আপসী মনোভাব নিয়ে চললে শেষটা সামলানো পুরুষের পক্ষেই বড় কঠিন হয়ে পড়ে। রাধা কৃষ্ণের কাহিনীও কি তেমনটা নয়? আলোচনা করে দুই বন্ধু মিলি ও কাদম্বরী। পৌরাণিক আখ্যান তবু বাস্তবের সঙ্গে গা মাখামাখি করে থাকে। কেন হঠাৎ শ্রীকৃষ্ণ রণে ভঙ্গ দিয়ে মথুরা বৃন্দাবন ছেড়ে, তার প্রেয়সী রাধিকাকে ছেড়ে চলে গেলেন দ্বারকা তে। কেন প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে উঠলো তার প্রজা প্রীতি? সামাজিক দায়বদ্ধতা কেন তার কাছে এত বড় হলো যে তিনি তাঁর রাধাকে ছেড়ে চলে গেলেন। তবে কি যুগে যুগে কালে কালে প্রেমিকারাই বিরহ যন্ত্রণা বুকে ধারণ করে বসে থাকবে আর প্রেমিক খেলাধুলার শেষে সামাজিক, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, রাজনীতি আর আত্মকেন্দ্রিকতায় নিমজ্জিত রাখবে নিজেকে।
মগধরাজ জরাসন্ধের বারবার আক্রমণে মথুরার প্রজা ও যাদবদের জীবন বিপন্ন হওয়ায় তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে মথুরা থেকে পশ্চিমে গিয়ে দ্বারকা নামক সুরক্ষিত নগরী স্থাপন করেন শ্রীকৃষ্ণ। এই দায়িত্ব কর্তব্য পালনের জন্য তাঁকে বৃন্দাবন ও রাধার সান্নিধ্য চিরকালের মতো ত্যাগ করতে হলো কেন ? যে প্রেম সীমাবদ্ধ নয়, যে প্রেম আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস সেই প্রেমকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সান্নিধ্যকে পাথেয় না করে বিচ্ছেদ কে পাথেয় করতে হলো কেন?
শ্রীকৃষ্ণ নিজেই নাকি রাধাকে বলেছিলেন যে তাঁর সাথে শারীরিক বিচ্ছেদ হলেও রাধা চিরকাল তাঁর হৃদয়েই থাকবেন। হৃদয় কি মানুষ দেখতে পায়? বিচ্ছেদ সম্পন্ন করা একটি ক্রিয়া, দেখা যায়, কিন্তু হৃদয় চিরে তো কেউ দেখেনা কার ছবি আছে সেখানে।
যুগ যুগ ধরে পরকীয়া প্রেম প্রমাণ করেছে পুরুষ চরিত্র কতটা দুর্বল। সে সুপ্রিয়া উত্তমের জীবন হোক বা রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক উপাখ্যান। হয়তো সেই প্রবাদটাই সত্য। 'পুরুষের ভালোবাসা মুসলমানের মুরগি পোষা'।
জীবনের অন্তিমে রাধা কৃষ্ণের বাঁশি, যা তিনি নিজের কর্ণেন্দ্রীয়ে ধারণ করেছিলেন, শুনতে শুনতে দেহত্যাগ করেন এবং কৃষ্ণের সঙ্গেই বিলীন হয়ে যান। রাধার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর শ্রীকৃষ্ণ নিজের বাঁশি ভেঙে ফেলেন কারণ সেই বাঁশির আর প্রয়োজন ছিলনা। সেই বাঁশি ছিল আত্মনিবেদন ও আধ্যাত্মিক আহ্বানের প্রতীক। বাঁশির সুরের সম্মোহিণী শক্তি দিয়ে বিমোহিত করার প্রয়োজন আর রইলো না। যদি প্রেম ভালোবাসা বলে সত্যিই কিছু থাকে তবে মুক্তির পথ প্রদর্শক রাধা ও আত্মত্যাগের উদাহরণ সুপ্রিয়া দেবী।
