Logo
logo

গল্প / কাহিনী

প্রবন্ধ: বৃষ্টি মানেই মুক্তি

ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের দিন কাটতো কঠিন নিয়ম আর গৃহশিক্ষকের শাসনে। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই সেই বাঁধন আলগা হয়ে যেত।
তিনি লিখেছেন, বৃষ্টির দিনে পড়াশোনা বন্ধ থাকতো। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখা, ছাদের জল পড়ার শব্দ শোনা, আর মন চলে যেত কল্পনার জগতে। ওই সময়টাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
বৃষ্টির সময় বাগানের গাছপালা, ভেজা মাটির গন্ধ, পুকুরের জল টলমল করা—এসবই শিশু রবীন্দ্রনাথের মনে গভীর দাগ কাটে।
"ছেলেবেলা"-য় তিনি বারবার বলেছেন, প্রকৃতির এই রূপই তার মনে কবিতার বীজ বুনে দিয়েছিল। বৃষ্টি ছিল সেই প্রথম শিক্ষক, যে তাকে বইয়ের বাইরের জগৎ চিনিয়েছিল।
বৃষ্টি থামলেই ছেলেরা বেরিয়ে পড়তো কাগজের নৌকা ভাসাতে, কাদায় পা ডোবাতে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই দুষ্টুমিতে শামিল হতেন।
এই অংশগুলোতে বৃষ্টি মানেই নিষেধের বাইরে একটা ছোট্ট স্বাধীনতার জগৎ
সোজা কথায়, "ছেলেবেলা"-য় বৃষ্টি হলো শৈশবের সেই অংশ যেখানে শাসন নেই, ভয় নেই, শুধু আছে কৌতূহল আর আনন্দ। রবীন্দ্রনাথ পরে তার কবিতা-গানে বৃষ্টিকে যে এত সুন্দর করে এঁকেছেন, তার শিকড় এই ছেলেবেলার অভিজ্ঞতাতেই।

একজন মানুষ যিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সুরকার, দার্শনিক, রাজনীতিক, সৌন্দর্যৈর পূজারী, তাঁর সঙ্গে প্রকৃতির যে নিগূঢ় বন্ধন থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। তাঁর প্রকৃতি প্রেম কয়েকটি অনুচ্ছেদে তুলে ধরা অসম্ভব। তাঁর বাস্তব বোধ, আবেগ, পূজা মানবপ্রেম ও প্রকৃতিকে একাকার করেছে তাঁর সব কাজে।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ঋতু বর্ষা। ছোটবেলা থেকেই গঙ্গা নদীর বুকে অঝোর বর্ষণ কবিকে বেঁধেছে এক মায়ার নিবিড় বাঁধনে। ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ছিল পূর্ব বঙ্গের শিলাইদহে। কবি পদ্মানদীর তীরবর্তী অঞ্চলে অনেকদিন একটানা অবস্থান করেছেন ও প্রত্যক্ষ করেছেন বর্ষার শান্ত ও অশান্ত রূপ। প্রকৃতি এমন জিনিস যে শুধু তার স্নিগ্ধ রূপেই নয়, প্রলয়ঙ্করী রূপেও লুকিয়ে থাকে মায়াময় অপ্রতিম সৌন্দর্য। প্লাবিত বিস্ফারিত দুই তীর তার মাঝেই জীবনযাত্রার টানাপোড়েন। মিলে যায় প্রকৃতি ও মানবজীবন বার বার প্রকাশ পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে, কবিতায়, গল্প উপন্যাসে।
কবির বর্ষা ঋতু ভাব আবেগের প্রেক্ষিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বাস্তব বোধেও উঁকি দিয়ে যায় বৃষ্টির ছাঁট। 'সোনার তরী' কাব্য বই এর 'পুরস্কার' কবিতাটির কথাই ধরা যাক যেখানে কবিতাটি শুরু হয়েছে এই বলে - "সেদিন বরষা ঝর ঝর ঝরে,
কহিল কবির স্ত্রী
রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়
রচিতেছ বসি পুঁথি বড় বড়
মাথার উপর বাড়ি পড় পড়
তার খোঁজ রাখো কি?"
বর্ষার দিনে কবির স্ত্রী বাস্তবের ছায়া যিনি কবিকে সংসারের হাল হাকিকত সম্পর্কে অবগত করছেন কখনও বিনয়ে কখনও প্রণয়ে।

সরস্বতী সাধনায় তৃপ্তি খোঁজা কবির ধ্যান জ্ঞান কাব্য সৃষ্টি। তাঁর বাড়ির ছাদের অবস্থা নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। তাই সেই বর্ষার দিনে তাঁর স্ত্রী বলছেন, " ভারতীরে ছাড়ি ধর এই বেলা লক্ষ্মীর উপাসনা।.....এতো শিখিয়াছ, এটুকু শেখনি কিসে কড়ি আসে দুটো।"

মানুষ ও প্রকৃতি কখনই বিচ্ছিন্ন নয় বরং প্রকৃতির উপাদান মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একাত্বতা চিরন্তন। আর যা কিছু চিরন্তন তাই সত্য। তাই তার সমস্ত লেখায় বর্ষা, শরৎ, বসন্ত শুধু প্রেক্ষাপট নির্মান করেনি, প্রকৃতি চিত্রায়িত হয়েছে নিপুণ উপায়ে। মানুষের সুখ দুঃখ হাসি কান্নার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতির মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে সংবেদনশীল চরিত্রগুলির অন্তর্জগৎ।

রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার গল্প সম্পর্কে বলেছেন ‘একটু একটু করে লিখছি এবং বাইরের প্রকৃতির সমস্ত ছায়া আলোক বর্ণ ধ্বনি আমার লেখার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আমি যেসব দৃশ্যলোক ও ঘটনা কল্পনা করছি, তারই চারদিকে এই রৌদ্র-বৃষ্টি, নদীর স্রোত এবং নদীতীরে শরবন, এই বর্ষার আকাশ, এই ছায়া বেষ্টিত গ্রাম, এই জলধারা প্রফুল্ল শস্যের ক্ষেত ঘিরে দাঁড়িয়ে তাদের সত্যে ও সৌন্দর্যে সজীব করে তুলছে।’

রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের চরিত্রগুলো প্রকৃতিকে আবেষ্টন করে আছে। এখানে প্রকৃতি একটি বিশাল চরিত্র। ‘মিট মিট করিয়া প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং এক স্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ টপ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল।’ প্রকৃতির এই প্রতীকী উপস্থাপনা যেন রতনের হৃদয়ের ক্ষরণের চিত্র। আবার, পোস্টমাস্টার রতনকে ছেড়ে কলকাতায় যাবার পথে "বর্ষার নদীতে বিশেষ পরিবর্তনের আলম্বন বিভাবের চক্র লক্ষ্য করে ‘বর্ষা বিস্ফোরিত নদীধরনীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মত চারিদিকে ছল ছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অন্তত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন। একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুন মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মকথা প্রকাশ করিতে লাগিল। -- পালে তখন বাতাস পাইয়াছে বর্ষার স্রোত ও খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করে নদী কুলের শ্মশান দেখা যাইতেছে"

'একরাত্রি' গল্পের কথাই ধরা যাক না কেন। শৈশব বয়সে বৌ বৌ খেলা উৎপাদিত বিশেষ অধিকার, বিশেষ দাবি ছিন্ন ভিন্ন হয় যৌবনের খামখেয়ালে মনের আনাচ কানাচ ঘিরে অবচেতনে লালিত স্পৃহা একদিন হঠাৎ দুজনকে দাঁড় করায় জলমগ্ন পাঁচ ছয় হাতের দ্বীপে । মানব প্রকৃতি ও বাহ্যিক প্রকৃতির বাধা পড়ে এক তারে যা দেয় মহাপ্রলয়ের তীরে দাঁড়িয়ে অনন্ত আনন্দের আস্বাদ।
রবীন্দ্রনাথের 'ছুটি' গল্পে গ্রাম ও শহরের প্রকৃতিতে ও সংসারের বাস্তব চিত্রের মাঝে বর্ণিত হয়েছে দুঃখ অভিমান নালিশ স্বার্থ জড়িত চরিত্রগুলি। ফটিকের গ্রাম জীবনে ছিল মুক্ত হাওয়া, নদী গাছপালা আর অবাধ স্বাধীনতা। মায়ের ওপর অভিমান করে মামার সঙ্গে শহরে এসে যান্ত্রিক জীবনে বন্দী হয় ফটিক। তার মুক্তি অন্বেষণ আর শ্রাবণের মুষলধারে বর্ষণ জীবনের গতি রেখাকে এক করে দেয়। পুলিশ যখন মায়ের কাছে যেতে চাওয়া ফটিককে ধরে আনে বিশ্বম্ভরবাবুর কাছে তখনও অবিশ্রাম বৃষ্টি ও রাস্তায় এক হাঁটু জল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ফটিকের জীবন প্রদীপ স্তিমিত হয়ে আসা যেন এক সূত্রে বাঁধা।

গল্পে বা ছোটগল্পে শুধু নয়, তাঁর আত্মজীবনী 'জীবনস্মৃতি' বলে দেয় রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির প্রতি তীব্র আকর্ষণ শৈশব বেলা থেকে। বাড়ির আশপাশে সবুজের বিস্তৃতি, জলের হাঁস, আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা, ভোরের আলো সব স্পর্শ করতো কবির মন। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি পথের পথপরিচায়ক প্রকৃতি রঙ রূপ বাহার বৈচিত্র্যে। প্রকৃতির মধ্যে তিনি আবিষ্কার করেছেন প্রচ্ছন্ন মানবিক সত্তাকে, অসীমকে। সত্যের স্বরূপ ফুটেছে নিয়মে আর আনন্দের রূপ প্রকাশিত হয়েছে ব্যতিক্রমে। প্রকৃতি বন্ধু, প্রকৃতি নিবেদনের ভাষা। একলা পথের চলা রমনীয় করে আলো, হাওয়া, বৃষ্টি। প্রকৃতি থেকে ছিনিয়ে পৃথক না করে যে সত্তাকে তিনি বেঁধেছেন নিগূঢ় পাশে, সেই তো বন্ধু, তাঁকেই তো বলা যায়
"বন্ধু রহো, রহো সাথে
আজি এ সঘন শ্রাবণ প্রাতে......
আজি এ বাদলে আকুল হাওয়ায় রে-
কথা কও মোর হৃদয়ে,
হাত রাখো হাতে।"

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com