গল্প - শেষ বিকেলের শালবন
বীরভূমের ছোট্ট গ্রাম সোনাঝুরির নাম শুনলেই অনিকের চোখের সামনে ভেসে উঠত লাল মাটির রাস্তা, দূরে শাল-পিয়ালের সারি আর বিকেলের সোনালি আলো। কিন্তু শহরের ব্যস্ত জীবন তাকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছিল সেই গ্রাম থেকে। কলকাতার একটি বড় অফিসে চাকরি করতে করতে সে যেন ভুলেই গিয়েছিল কেমন ছিল তার শৈশবের সেই প্রকৃতি-ভরা দিনগুলো।
একদিন আচমকা খবর এল—তার ঠাকুরদা খুব অসুস্থ। বহুদিন পর অনিক ফিরল সোনাঝুরিতে। ট্রেন থেকে নামতেই বুক ভরে সে টের পেল গ্রামের সেই চেনা গন্ধ। কাঁচা মাটির গন্ধ, বৃষ্টিভেজা পাতার গন্ধ, আর কোথাও যেন ভেসে আসছে রবীন্দ্রসঙ্গীত—
“গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ…”
অনিক একটু থমকে দাঁড়াল। স্টেশনের পাশে এক চায়ের দোকানে পুরোনো রেডিওতে গানটা বাজছিল। মুহূর্তের জন্য মনে হল, এই গান যেন তাকে ডাকছে।
বাড়িতে পৌঁছাতেই ঠাকুরদা মৃদু হেসে বললেন, — “এসেছিস? ভাবছিলাম, শহর তোকে পুরোপুরি গিলে ফেলেছে।”
অনিক মাথা নিচু করে বসে রইল। সত্যিই তো, সে আর আগের মতো নেই। ছোটবেলায় যে ছেলে গাছের ডালে বসে পাখির ডাক শুনত, সে এখন সারাদিন কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সেই রাতে হঠাৎ ঝড় উঠল। জানলার বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে অনিকের মনে পড়ে গেল তার ছোটবেলার শিক্ষক অমলেন্দু বাবুর কথা। তিনি বলতেন, — “রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে শুধু বই পড়লে হবে না, প্রকৃতিকে দেখতে হবে। কারণ প্রকৃতিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক।”
পরদিন ভোরে অনিক হাঁটতে বেরোল। আকাশে তখনও ভোরের নরম আলো। শালবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে দেখল শিশিরভেজা ঘাসে কয়েকটি সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোকিলের ডাক। বাতাসে কেমন এক শান্তি।
হঠাৎ সে শুনতে পেল কারও গলার আওয়াজ। — “আপনি কি অনিকদা?”
অনিক ঘুরে দেখল, একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। বয়স বড়জোর বাইশ-তেইশ। পরনে সাদা-নীল সুতির শাড়ি। হাতে কিছু বই।
— “হ্যাঁ। তুমি?”
— “আমি মেঘলা। এখানে স্কুলে পড়াই। আপনার ঠাকুরদা আমাকে অনেক গল্প বলেছেন আপনার কথা।”
মেয়েটির চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ছিল। কথা বলতে বলতে জানা গেল, সে রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে গ্রামের বাচ্চাদের পড়ায়। শুধু পড়ায় নয়, তাদের প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেও শেখায়।
মেঘলা হেসে বলল, — “আজ বিকেলে সময় থাকলে আমাদের স্কুলে আসবেন? আমরা রবীন্দ্রনাথ আর প্রকৃতি নিয়ে একটা ছোট অনুষ্ঠান করছি।”
অনিক প্রথমে রাজি হতে চাইল না। কিন্তু পরে কেমন যেন অজান্তেই বলে ফেলল, — “আচ্ছা, আসব।”
বিকেলে স্কুলে গিয়ে অনিক অবাক হয়ে গেল। ছোট্ট মাঠের মাঝে গাছের তলায় বাচ্চারা গোল হয়ে বসে আছে। কেউ কবিতা আবৃত্তি করছে, কেউ গান গাইছে।
একটি ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে বলছিল, — “রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে শুধু দেখেননি, অনুভব করেছিলেন। তাই তাঁর কবিতায় নদী কথা বলে, আকাশ হাসে, বাতাস গান গায়।”
অনিক চুপচাপ শুনছিল। এতদিন পর তার মনে হচ্ছিল, সে যেন আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া একটা অংশকে খুঁজে পাচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে মেঘলা তাকে নিয়ে গেল স্কুলের পেছনের বাগানে। সেখানে ছোট ছোট গাছ লাগানো হয়েছে।
— “এই গাছগুলো বাচ্চারাই লাগিয়েছে,” মেঘলা বলল। “প্রতি রবিবার ওরা আসে জল দিতে।”
অনিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “এত কষ্ট করো কেন?”
মেঘলা একটু হেসে বলল, — “কারণ প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। রবীন্দ্রনাথ তো বলেছিলেন, মানুষ আর প্রকৃতি আলাদা নয়।”
সেদিন রাতে অনিক ঘুমোতে পারল না। জানলার বাইরে চাঁদের আলো পড়েছিল আমগাছের পাতায়। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে মনে মনে ভাবছিল, শহরে ফিরে গেলে আবার কি আগের মতো ব্যস্ত জীবনে ডুবে যাবে?
পরদিন সকালে ঠাকুরদা তাকে ডাকলেন। হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
— “এটা তোর ঠাকুমার। পড়ে দেখ।”
ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। অনিক ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল। সেখানে লেখা—
“আজ শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর জন্মদিন পালন হল। চারপাশে গাছ, পাখি আর মানুষের হাসি দেখে মনে হল, প্রকৃতি যেন মানুষের আত্মীয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে জীবনকে ভালোবাসা।”
অনিকের চোখ ভিজে এল। তার ঠাকুমা ছিলেন খুব সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু তাঁর লেখার মধ্যে কী গভীর অনুভূতি!
কয়েকদিনের মধ্যে ঠাকুরদা একটু সুস্থ হয়ে উঠলেন। অনিকের শহরে ফেরার সময় এগিয়ে এল। কিন্তু এবার তার মনে অদ্ভুত টান তৈরি হল গ্রামের প্রতি।
শহরে ফেরার আগের দিন বিকেলে সে আবার শালবনের দিকে গেল। সেখানে মেঘলা দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ।
মেঘলা বলল, — “আপনি আবার কবে আসবেন?”
অনিক একটু চুপ করে থেকে বলল, — “জানি না। তবে এবার মনে হচ্ছে, এতদিন আমি ভুল জায়গায় ছিলাম।”
মেঘলা মৃদু হেসে বলল, — “মানুষ যত দূরেই যাক, প্রকৃতি তাকে একদিন ফিরিয়ে আনে।”
হঠাৎ দূরে কালো মেঘ জমল। অল্প সময়ের মধ্যেই বৃষ্টি নামল। দু’জনে একটি বড় শালগাছের নিচে দাঁড়াল। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে মিষ্টি গন্ধ উঠছিল।
অনিক বলল, — “জানো, অনেকদিন পর আজ সত্যিই মনে হচ্ছে আমি বেঁচে আছি।”
মেঘলা কিছু বলল না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই রাতে অনিক সিদ্ধান্ত নিল। সে শহরের চাকরি পুরোপুরি ছাড়বে না, কিন্তু নিজের গ্রামের জন্য কিছু করবে। অন্তত গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের জন্য একটা লাইব্রেরি তৈরি করবে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের বই থাকবে, প্রকৃতি নিয়ে বই থাকবে।
শহরে ফিরে গিয়েও সে বদলে গেল। অফিসের কাজের ফাঁকে সে আর আগের মতো শুধু মোবাইল দেখত না। জানলার বাইরে আকাশ দেখত। সন্ধ্যায় ছাদে গিয়ে গাছের টবে জল দিত। মাঝে মাঝে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনত।
একদিন তার অফিসের এক সহকর্মী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “তুই এত বদলে গেলি কী করে?”
অনিক একটু হেসে বলল, — “প্রকৃতির কাছে গিয়েছিলাম।”
কয়েক মাস পরে আবার সে সোনাঝুরিতে ফিরল। এবার তার হাতে অনেক বই। গ্রামের স্কুলের এক কোণে ছোট্ট লাইব্রেরি তৈরি হল। উদ্বোধনের দিন বাচ্চারা গান গাইল—
“আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ…”
অনিকের চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল, রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি প্রকৃতির মাধ্যমে মানুষকে নিজের ভিতরটা চিনতে শিখিয়েছেন।
অনুষ্ঠান শেষে মেঘলা বলল, — “আপনার লাইব্রেরির একটা নাম দিতে হবে।”
অনিক একটু ভেবে বলল, — “নাম হোক ‘প্রকৃতির পাঠশালা’।”
সবাই হাততালি দিল।
সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। আকাশে লাল আভা। শালবনের পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া বইছে। দূরে কারও গলায় ভেসে আসছে রবীন্দ্রসঙ্গীত—
“আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…”
অনিক আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, — “কবি, আপনার প্রকৃতিকে আমি এতদিন পরে চিনতে পারলাম।”
তার মনে হল, জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি হয়তো বড় শহরের আলোয় নয়, বরং গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে লুকিয়ে থাকে।
সেই দিন থেকে সোনাঝুরির ছোট্ট স্কুলে প্রতি বছর ‘রবীন্দ্রনাথ ও প্রকৃতি’ উৎসব পালিত হতে লাগল। বাচ্চারা গাছ লাগাত, কবিতা পড়ত, গান গাইত। আর অনিক যখনই সময় পেত, চলে আসত সেই গ্রামে।
এক বর্ষার দিনে মেঘলা তাকে বলেছিল, — “জানেন, মানুষ যখন প্রকৃতিকে ভালোবাসে, তখন তার মনও সুন্দর হয়ে যায়।”
অনিক হেসে বলেছিল, — “হয়তো সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের এত কাছের।”
বৃষ্টির ফোঁটা তখন টুপটাপ করে পড়ছিল মাটিতে। শালগাছের পাতাগুলো দুলছিল বাতাসে। প্রকৃতি যেন নিজেই নিঃশব্দে গেয়ে চলেছিল কবিগুরুর গান।
