Logo
logo

গল্প / কাহিনী

গল্প - ঋণী

ক্যাঁ - চ -চ - চ !!!
হঠাৎ বোলেরো গাড়িটা খুব জোড়ে ব্রেক কষে , পাহাড়ি উৎরাইয়ের পথে দাঁড়িয়ে পড়লো । তামাং লামা খুবই দক্ষ ড্রাইভার । নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে । বয়স্ক মানুষ অসিত বাবু খানিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লো । নাতি বুম্বা পাশেই ছিল । সে ভয় না পেলেও চমকিত হয়ে বলল, " ড্রাইভার আঙ্কেল , কি হয়েছে ?" তামাং হাসি মুখে সবাইকে আস্বস্ত করে বলল , " না সেরকম কিছু হয়নি । গাড়ির সামনে একটা রাস্তার বাচ্চা কুকুর চলে এসেছিলো । ওকে বাঁচানোর জন্য গাড়িটা থামাতে হয়েছে । " তামাং এর কথা শেষ হতে না হতেই প্রবীর এবং রমা গাড়ির দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো । সত্যিই তাই , একটা বাচ্চা কুকুর ছানা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে রাস্তার একপাশে , ওদের দিকে চেয়ে বসে আছে । কালিংপং এর রাস্তায় হামেশাই এইরকম কুকুর দেখা যায় । সবার অজান্তেই বুম্বাও চলে এসেছে । গায়ে লোম ভর্তি বাচ্চা কুকুরটিকে দেখতে পেয়েই বুম্বা একদম কোলে জাপ্টে ধরে , বাবা - মা কে বলল , "আমি ওকে পুষবো ।"
প্রবীর এবার প্রমাদ গুনলো । কারণ , অসিত বাবু এইসব জন্তু জানোয়ার পোষা একদমই পছন্দ করেন না । রমাও ছেলেকে বায়না করতে নিষেধ করলো । কিন্তু বুম্বার ধনুক ভাঙ্গা
পণ । সে এই কুকুর ছানাটিকে পুষবে । অবশ্য বাড়ির সকলে বুম্বার এই পশুপ্রীতির ব্যাপারে পরিচিত । চেঁচামেচি শুনে দাদু গাড়ির ভিতর থেকেই চিৎকার করে জানতে চাইলেন , কি হয়েছে ? অসিত বাবু একদমই রাজি হলেন না , বুম্বার এই আবদারে । অনেক কথা কাটাকাটির পর বুম্বার আবদারের কাছে দাদু নতি স্বীকার করলো ।
দার্জিলিং ভ্রমণের শেষে সকলে বাড়ি ফিরলো । সাথে অবশ্যই বুম্বার নয়নের মনি , দার্জিলিং এর রাস্তা থেকে পাওয়া সেই বাচ্চা কুকুরটিও এলো । কালচে বাদামী রঙের , বড় বড় লোমওয়ালা কুকুর ছানাটির , বাড়ি আসার পথেই নাম ঠিক হয়ে গেলো । ওর নাম রাখা হলো কোকো । কারণ , কোকোর মতোই গায়ের রং ।
- চার মাস পরে -
বেহালার রায় বাহাদুর রোডে , নিজেদের বাড়ি অসিত বাবুর । বহু পুরোনো বাসিন্দা হলেও পাড়ার লোকেরা অসিত বাবুকে মিশুকে বলতে পারবে না । কম কথার মানুষ । কোনো ঝামেলা পছন্দ করেন না । নিজের ব্যবসা নিয়েই থাকেন । বছর কয়েক আগে স্ত্রী বিয়োগের পর অসিত বাবুকে আরও অন্তরর্মুখী এবং গম্ভীর প্রকৃতির করে দিয়েছে ।
একমাত্র ছেলে প্রবীর , ছেলের বৌ রমা এবং ছয় বছরের ছটফটে নাতি বুম্বা কে নিয়েই অসিত বাবুর পৃথিবী । নাতি , অসিত বাবুর অন্ধের যষ্ঠী । প্রবীর ব্যবসার দায়িত্বে থাকলেও , অসিত বাবুকেই ব্যবসার খুঁটিনাটি দেখতে হয় । তবে বাড়িতে বসেই মূলত নজরদারির কাজ সামলান ।
রমা কিন্তু আধুনিকা হলেও শ্বশুরের যত্নের কোন ত্রুটি রাখে না । প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কেনাকাটা একটু বেশিই করে । অসিত কিন্তু অর্থের এই অপচয় কে স্নেহের দৃষ্টিতে মেনে নেয় । মাঝে মাঝে অবশ্য মৃদু শাসন করতে ছাড়েন না ।
কড়া ধাতের মানুষ হলেও অসিতের যুক্তি , শাসন পথ হারিয়ে ফেলে , যদি বুম্বার বিষয়ে কোনো ব্যাপার হয় । বুম্বার জন্য ছিল অসিত বাবুর মাত্রা ছাড়া প্রশ্রয় । এই মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয়ের জন্য মাঝে মাঝে প্রবীর এবং রমা , অসিত বাবুর কাছে অভিযোগ করতো । কিন্তু কোনো লাভ হতো না ।
পাড়ায় কিন্ত বুম্বা অত্যন্ত জনপ্রিয় , ওর মিষ্টি স্বভাব এবং দাবা খেলার নিপুনতার জন্য। মাত্র ছয় বছরের একটি শিশু যে এতো বুদ্ধি ধরে , পাড়ার সকলেই অবাক হয়ে যায় । ইতিমধ্যেই স্থানীয় স্তরে দাবার বয়স ভিত্তিক প্রতিযোগিতাতে বুম্বা বলা যেতে পারে অপ্রতিরোধ্য । বুম্বার ফ্রেন্ড , ফিলজোফার এবং অভিভাবক দাদু অসিত । দাদুর অভিজ্ঞ চোখে নাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পেরেছিল । বেহালার "ওরিয়েন্ট ডে স্কুল" এ পড়ে নাতি বুম্বা । প্রথম শ্রেণীর ছাত্র । স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসিত বাবু নিজে কথা বলে , বুম্বার দাবার প্রতিভাকে এগিয়ে নিয়ে যাওযার ব্যবস্থা করে ফেলেছে । ছেলে প্রবীর কে বলে , কলকাতার পৃথিবী বিখ্যাত দাবারু দিব্যেন্দু বড়ুয়ার চেস একাডেমিতে প্রথাগত শিক্ষার ব্যবস্থা করে ফেলেছে ।
রমা কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘরদোর ঝাড়পোছের কাজ এগোতে লাগলো । বাড়ির দুইজন কাজের মেয়েও রমার নির্দেশ অনুযায়ী কাজে সাহায্য করতে লাগলো । সপ্তাহ দুয়েকের পরেই পয়লা বৈশাখ । অসিতের নিজের ব্যবসার জন্য "হাল খাতার" ব্যবস্থা করতেই হয় । এবারও যথেষ্ট ধুমধাম করে লক্ষী গণেশের পুজো হবে । নববর্ষের দিনে কর্মচারী এবং আত্মীয় স্বজনে বাড়িটা পরিপূর্ণ থাকে । তাই রমা খুবই ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ , সময়ের মধ্যে শেষ করতে বদ্ধপরিকর ।
বাড়িতে সামনে বড় উৎসব । প্রবীর এবং রমা ঠিক করলো আজই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা যতটা সম্ভব করে ফেলবে । খেয়েদেয়ে দুপুরের দিকে বেরোবে বলে পরিকল্পনা হলো । রমা সুযোগ বুঝে অসিত বাবুর ঘরে ঢুকলো । রমা বললো , " বাবা , আপনি তো প্রতি বছরই আমাদের নিয়ে নববর্ষের কেনাকাটা করতে যান। তাহলে আজই আমরা বেড়িয়ে পরি । আপনি তৈরী হয়ে নেবেন । আমরা দুপুরের দিকে বেরোবো ।"
রমা অসিত বাবু কে কোনো উত্তর দিতে না দেখে খানিকটা অবাকই হয়ে গেলো । বৌমাকে অসিত নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন । তাহলে আজ কি হলো ? রমা কাছে এসে আবার জিজ্ঞাসা করায় , অসিত অস্ফুট স্বরে বললো , " বৌমা , আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না । আমি আজ তোমাদের সঙ্গে যেতে পারছি না । তোমরাই যাও । কোনো জিজ্ঞাস্য থাকলে আমাকে ফোন করে নিও ।
রমা বুঝতে পারলো , শ্বশুর মশাইয়ের শরীর এবং মন ভালো নেই সঙ্গত কিছু কারণেই । বেশি কথা বললে অসিত বিরক্ত হয় । তাই শারীরিক বিশেষ কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা , শুধু সেটাই রমা বুঝে নিতে চাইলো । বয়সের কারণে কিছু শারীরিক সমস্যা তো রয়েছেই । রমা তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ পত্র , শ্বশুরের হাতের কাছে গুছিয়ে রাখলো । দরকারে যাতে খুঁজতে না হয় ।
সকলেই নববর্ষের কেনাকাটা করতে বেড়িয়ে গেলো । বাড়িতে থেকে গেলেন অসিত বাবু এবং বুম্বার সর্বক্ষণের সঙ্গী কোকো । কোকো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমান । তার প্রমান বাড়ির সকলেই বারংবার পেয়েছে । সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার , যে অসিত বাবু জন্তু জানোয়ার একদমই পছন্দ করতেন না , কোকো নিজগুনে সেই অসিত বাবুর নয়নের মনি হয়ে উঠেছে । কেন জানা নেই , কোকো কিন্ত বাড়ির সকলের থেকে অসিত বাবুকেই বেশি পছন্দ করে ।
দুপুর বেলার চুপচাপ পরিবেশে অসিত বাবু খাওয়া দাওয়ার পর , আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ দেখছিলেন । কোকো পায়ের কাছে শুয়ে রয়েছে , কিন্তু সজাগ দৃষ্টিতে অসিত বাবুর দিকে চেয়ে রয়েছে ।
অনেকেই বলে কুকুরের ষষ্ঠইন্দ্রিয় নাকি খুবই প্রবল হয় । কোকো কিছু একটা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছিলো । সে অস্বাভাবিক ভাবে অসিত বাবুর পা দুটি ক্রমাগত শুকে যাচ্ছিলো । খানিকক্ষণ ধরে গড় গড় করে মৃদু ডাকছিলো । অন্যসময়ে হলে অসিত বাবু কোকোর গায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিত । কিন্তু আজ সেসব কিছুই করলেন না । এইভাবেই আধা ঘন্টা কেটে গেলো । হঠাৎ কোকো লক্ষ্য করলো , অসিত বাবু হাত থেকে একধারে খবরের কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেলো । হাতদুটো শরীরের দুইপাশে এলিয়ে পড়লো অসিত বাবুর । কোকো লাফিয়ে উঠেই তারস্বরে ডাকতে লাগলো এবং ঘরের মধ্যে দিশাহীন ভাবে ছোটাছুটি করতে লাগলো । কিন্তু অসিত বাবুর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না । কোকোর অসাধারণ বুদ্ধি । সে দৌড়ে দোতলার ব্যালকনির দিকে ছুটে গেলো । রাস্তার ধারে বাড়ি । তাই কেউ না কেউ রাস্তা দিয়ে যাবেই । কোকো অনেক ডাকাডাকি করেও কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলো না । রমা কিছু গাছ দিয়ে ব্যালকনি সাজিয়েছে । নিজের হাতেই রক্ষনাবেক্ষন করে । বারান্দার ধারে এক বালতি জল রাখা ছিল । সময় মতো রমা গাছে জল দেবে বলে । সেই বালতিতে কোকোর নজর গেলো । অত্যন্ত বুদ্ধিমান কোকো ওপর থেকে দেখলো একজন ভদ্রলোক নিচ দিয়ে যাচ্ছে । অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কোকো ওই জলের বালতিটা ধাক্কা দিয়ে উল্টিয়ে দিল । রাস্তা দিয়ে যাওয়া ভদ্রলোকের গায়ে ওই জল পড়ে জামাকাপড় ভিজে গেলো । ওপরদিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক রেগে গিয়ে চিৎকার করে কিছু বলতে লাগলো । খুব রেগে গিয়ে ওই ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলো । রমা শ্বশুরের শরীর খারাপ বলে , দরজা ভেজিয়ে দিয়ে কলাপসিবল গেট টা টেনে দিয়েছিলো । ক্রুদ্ধ ভদ্রলোক বাড়ির লোকজন কে ডাকতে লাগলো । কোকো ঘরের ভিতর থেকে খুব চেঁচাতে লাগলো । এবার ভদ্রলোকের কিছুটা সন্দেহ হলো , এতো ডাকাডাকির পরেও কেউ না আসায় । কি ভেবে ওই ভদ্রলোক নিচে নেমে এসে পাড়ার আশেপাশের লোকজন কে ডেকে তার সন্দেহের কথা জানালো । কোন দেরী না করেই প্রতিবেশীদের কয়েকজন বুম্বাদের বাড়ির দোতালায় চলে এসে গেট খুলে ভিতরে এসে দেখলো , কোকো পাগলের মতো চিৎকার করছে আর ঘরের ভিতর দৌড়ে যাচ্ছে । প্রতিবেশীরা বুঝতে পারলো কিছু একটা ঘটেছে । তিন চার জন ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়লো । দেখা গেলো অসিত বাবু অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছে । বুঝে নিতে অসুবিধা হলো না সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে । পাড়ার একজনের কাছে প্রবীরের ফোন নম্বরটা ছিল । প্রবীর কে ফোনে সবকিছু জানানো হলো ।
মিনিট পনেরোর মধ্যেই প্রবীর এবং রমা ফিরে এলো । অসিত বাবুর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে । খুব দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলো । ডাক্তারেরা জানালো অবস্থা ভালো নয় । বাহাত্তর ঘন্টার আগে কিছুই বলা যাবে না । আপাতত ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে ।
অসিত বাবুর বয়সের কারণে বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব হলো না । কিন্ত চারটে স্টেন্ট বসাতে হয়েছে । কয়েকদিনের লড়াইয়ের পর এবং ডাক্তারদের অসাধারণ প্রয়াসের দৌলতে অসিত বাবু এখন স্থিতিশীল । জানা গেল , যদি অবস্থার অবনতি না হয় , তাহলে অসিত বাবুর দিন চারেকের মধ্যে ছুটি হয়ে যাবে ।
আজ পয়লা বৈশাখ । আজ অসিত বাবু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে । ঠিক সকাল দশটায় , হাসপাতালের ইমার্জেন্সির সামনে প্রবীর নিজেদের গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড় করালো । সঙ্গে রমা এবং ছোট কাকা রয়েছে । অসিত বাবু হাসপাতালের লিফট থেকে হুইল চেয়ারে করে গাড়ির সামনে এল । সকলে সাবধানে অসিত বাবুকে গাড়িতে বসালো ।
আসার পথে টালিগঞ্জের করুণাময়ী মন্দিরে শ্বশুরের মঙ্গলকামনায় পুজো দিল রমা । পয়লা বৈশাখের প্রচন্ড ভিড় মন্দিরে । মা করুণাময়ী খুবই জাগ্রত । মন্দিরের গেটে অনেক ফুল বিক্রি হচ্ছে । অসিত , ছেলে প্রবীর কে মৃদু স্বরে বললো , মন্দিরের গেটে বসে থাকা ফুল বিক্রেতার কাছ থেকে গোলাপ ফুলের তোরা এবং একটা বড় চকলেটের প্যাকেট কিনে আনতে । প্রবীর বললো , "বাবা , এগুলো তো তোমার খাওয়া বারণ আছে , তাহলে এই চকলেট দিয়ে কি হবে ?" অসিত কোনো উত্তর দিল না । শুধু মৃদু হেসে বললো , আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না । আমি ডাক্তারের কথা মেনেই চলবো । প্রবীর কথা বাড়ালো না । কিনে আনা গোলাপের তোরা এবং চকলেট , অসিত বাবু কোলে নিয়ে আঁকড়ে থাকলো । যেন এইগুলো বহু মূল্যবান রত্ন । গাড়ি বাড়ির পথে এগোল ।
সদর দরজা দিয়ে , হুইল চেয়ারে করেই অসিত বাবু একতলার ডাইনিং রুমের সামনে এসে প্রবীর কে বললো , কোকো এবং বুম্বা কে নিয়ে আসতে । বাড়িতে উপস্থিত অতিথিরা উদ্বিগ্ন হয়ে অসিত কে ঘিরে ধরলো । কিন্তু অসিতের কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই , শুধু কোকো আর বুম্বার আসার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো । বাড়ির কেউ যেন বললো , বুম্বা কোকো কে নিয়ে বাইরে একটু ঘুরতে গেছে । এক্ষুনি চলে আসবে ।
কথাবার্তার মাঝখানেই , বুম্বা কোকো কে সাথে নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকেই দাদু কে জড়িয়ে ধরলো । মনে হচ্ছে কেউ কাউকে কোনোদিন ছাড়বে না । অসিত কে দেখে কোকো স্বভাব বিরুদ্ধ নিচু স্বরে কুঁই কুঁই করতে লাগলো । সকলে অবাক হয়ে দেখলো , কোকোর দুই চোখ বেয়ে জল পড়ছে । কোকো কাঁদছে , প্রিয়জন কে ফিরে পাওয়ার জন্য আনন্দাশ্রু । কোকো তো আর কিছু চায় না , শুধু চায় বাড়ির সকলে সুস্থ থাকুক , আনন্দে থাকুক । আশ্রয় দাতার ঋণ সে যেন চোখের জল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইছে । অসিত বাবু বুঝতে পারলো , কোকোর অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা । কোকো এবং বুম্বার কাছে অসিতের ঋণ অপরিশোদ্ধ । বুম্বা এবং কোকোকে অসিত নিজের কাছে সযত্নে রেখে দেওয়া গোলাপের তোরা আর চকোলেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিল । কোকো চকোলেট খেতে ভীষণ ভালোবাসে । দুজনকে জড়িয়ে অসিত কাঁদতে কাঁদতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গান গেয়ে উঠলো -
এসো আমার ঘরে ।
বাহির হয়ে এসো , তুমি যে আছো অন্তরে ।।
স্বপনদুয়ার খুলে এসো অরুন - আলোকে
মুগ্ধ এ চোখে ।
ক্ষণকালের আভাস হতে চিরকালের তরে
এসো আমার ঘরে ।।
দুঃখ সুখের দোলে এসো , প্রাণের হিল্লোলে এসো ।
ছিলে আমার অরূপ বাণী ফাগুন বাতাসে
বোনের আকুল নিঃশ্বাসে -
এবার ফুলের প্রফুল্ল রূপ এসো বুকের পরে ।।
আজ পয়লা বৈশাখ । বাড়ির সকলের প্রাপ্তির ঝুলি পূর্ণ হলো । বাড়ির মহিলারা সকলে শঙ্খধনী এবং উলুদ্ধনি দিয়ে সিদ্ধিদাতার কাছে তাদের প্রার্থনা জানালো , অসিত বাবুর দ্রুত সুস্থতার জন্য ।
অসিত বাবু হুইল চেয়ারে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো । সবার আগে কোকো তার আশ্রয় দাতাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আর বুম্বা ? সে হয়তো আজকের স্মৃতি কে , তার জীবনের শ্রেষ্ট সম্পদ হিসাবে সারাজীবন আগলে রাখবে ।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com