গল্প - অপ্রকাশিত আলো
পহেলা বৈশাখের ভোর। আকাশটা আজ অন্য দিনের মতোই, তবুও যেন কোথাও একটু আলাদা—একটু নরম, একটু গভীর। বাতাসে মিশে আছে কাঁচা আমের টক গন্ধ, দূরে ঢাকের মৃদু আওয়াজ, আর মানুষের কণ্ঠে “শুভ নববর্ষ” উচ্চারণ।
কিন্তু এই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও কিছু মানুষ থাকে, যারা চুপচাপ নিজের ভিতরের শব্দগুলো শুনতে থাকে…
মেঘলা তাদেরই একজন।
জানলার পাশে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে আজ কোনো উৎসবের উচ্ছ্বাস নেই, আছে একরাশ ক্লান্তি—যা কারও চোখে ধরা পড়ে না।
গত বছরের প্রতিটা দিন যেন তাকে একটু একটু করে নিঃশব্দে ভেঙে দিয়েছে।
না-পাওয়া, হারানো, অপূর্ণতা—এই শব্দগুলোই যেন তার প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল।
সবাই ভাবে—সময় সব ঠিক করে দেয়।
কিন্তু সময় আসলে শুধু এগিয়ে যায়,
মানুষই নিজের ভেতরের ক্ষতগুলো বয়ে নিয়ে চলে।
মেঘলা হালকা করে হাসলো।
এই হাসিটা সে অনেকদিন ধরেই শিখে নিয়েছে—যেখানে কষ্ট লুকিয়ে থাকে, কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না।
ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো ডাইরীটা হঠাৎ চোখে পড়ল তার।
সে ধীরে ধীরে সেটি খুলল।
প্রতিটি পাতায় জমে আছে তার না-বলা কথা—
কিছু স্বপ্ন, যেগুলো সময়ের অভাবে নয়, সাহসের অভাবে থেমে গিয়েছিল।
কিছু সম্পর্ক, যেগুলো ভুল বোঝাবুঝির ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
আর কিছু প্রতিশ্রুতি—যেগুলো সে নিজেকেই দিয়েছিল, কিন্তু রাখতে পারেনি।
একটা পাতায় লেখা—
“আমি একদিন নিজেকে ভালোবাসতে শিখব…”
লাইনটা পড়ে তার বুকটা কেমন করে উঠল।
সে নিজেকেই প্রশ্ন করল—
“আমি কি সত্যিই কোনোদিন নিজের পাশে দাঁড়িয়েছি?”
বাইরে তখন ঢাকের শব্দটা একটু জোরালো হয়েছে।
জীবন যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—
“আমি থামি না, তুই কেন থেমে আছিস?”
মেঘলা চোখ বন্ধ করলো।
অনেকদিন পর সে নিজের ভিতরের কণ্ঠটা শুনতে পেল—
যেটা সবসময় চুপ করে ছিল, কিন্তু হারিয়ে যায়নি।
সে বুঝল—
নতুন বছর মানে সবকিছু নতুন হয়ে যাওয়া নয়।
পুরোনো কষ্টগুলো মুছে যায় না,
শুধু আমরা শিখি সেগুলো নিয়ে বাঁচতে…
আর একসময়, সেগুলোকেই শক্তি বানাতে।
সে ডাইরির একদম শেষ পাতায় লিখল—
“আমি আর নিজেকে অবহেলা করব না।
আমি আমার কষ্টগুলোকে লুকিয়ে রাখব না,
আমি সেগুলোকে গ্রহণ করব।
আমি ধীরে ধীরে হলেও নিজের দিকে ফিরব,
নিজের হাতটা নিজেই ধরব।
কারণ,
সবাই ছেড়ে গেলেও—
আমার পাশে আমাকেই থাকতে হবে।”
তার চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল,
কিন্তু এই জলটা কষ্টের ছিল না—
এটা ছিল একরকম মুক্তি।
সূর্যটা তখন আকাশে একটু উঁচুতে উঠেছে।
আলোটা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে—
ঠিক যেমনভাবে মেঘলার ভেতরেও একটা নতুন আলো জন্ম নিচ্ছে।
সে জানে—
আগামী দিনগুলো সহজ হবে না।
আবার কষ্ট আসবে, আবার মন ভাঙবে…
কিন্তু এবার সে ভেঙে পড়বে না।
কারণ এবার সে শিখেছে—
অন্ধকারকে অস্বীকার করে আলো পাওয়া যায় না,
অন্ধকারকে নিজের অংশ হিসেবে মেনে নিলেই
আলোটা সত্যি হয়ে ওঠে।
নববর্ষ আসলে উৎসব নয়,
এটা নিজের ভিতরের সাথে এক নিঃশব্দ বোঝাপড়া—
যেখানে আমরা প্রতিজ্ঞা করি,
আমরা হারিয়ে গেলেও আবার নিজেকে খুঁজে নেব...
