Logo
logo

গল্প / কাহিনী

গল্প - চোখ

নতুন প্রজন্মে বাড়ির প্রথম বাচ্চা মৃগনয়নী। রায়বাড়ির সুমিতা রায়ের প্রথম নাতনি। সুমিতা দেবী তাঁর বড় ছেলের বৌ এনেছিলেন অনেক খুঁজে। তাঁর বাসনা ছিল বৌ অপরূপ সুন্দরী হবে। প্রায় কয়েক শত পাত্রী দেখে বেড়িয়েছেন রোদ জল ঝড় উপেক্ষা করে। শেষে হাওড়ার রামরাজাতলায় চৌধুরী বাড়ির মেয়ে পছন্দ হয় তাঁর। মাজা রঙ গায়ের আর অপূর্ব সুন্দর চোখ। যেন কোনো হরিণী তার সুন্দর চোখ জোড়া রেখে গেছে সে বাড়ির ছোট মেয়ের চোখ দুটিতে। সেই অপর্ণার মেয়ে হলো আজ। সবার আশা ছিল, যদি মেয়ে হয় যেন সে মায়ের মতোই দেখতে হয়। এ বাড়ির ছেলেদের দেখতে মন্দ না কিন্তু যা ছেলেদের মানায় তা মেয়েদের মানায় না বলেই মনে করে অনেকে।
হাসপাতালে বাচ্চা দেখতে গিয়ে সুমিতা দেবী আশাহত হলেন। মেয়ে হওয়াতে তার মন খারাপ নয়। মন খারাপ মেয়ের মুখখানি একদম বাপের মত। আর যাই পাক নাতনি তার মায়ের চোখ দুটি পায়নি। এ খবর ক্রমশঃ রটে গেল যে রায় বাড়ির বড় ছেলের মেয়ে তেমন সুন্দরী হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেনি। বংশের মুখ পেয়েছে। ছোট চোখ, বোঁচা নাক আর পাতলা ঠোঁট। সেই ছোট থেকে যেখানেই সে যায় সবাই বলে মেয়েকে মায়ের মতো দেখতে নয়। মায়ের চোখদুটি মেয়ে পায়নি।
যা নিজের হাতের মধ্যে না তাই নিয়ে মানুষের কত কথা। ছোট্ট তুলতুলি ছোটবেলা থেকে জেনে বড় হয়েছে যে তার রূপ তার মায়ের মত নয়।

সুমিতা দেবীর গ্রামের বাড়িতে বড়বৌ যেদিন প্রথম পা রেখেছিল সারা গ্রামের লোক এসেছিল বৌ দেখতে। সৌন্দর্য দেখে সবাই হাঁ। চোখের পাতা পড়ে না। কি সুন্দর মুখশ্রী আর কি সুন্দর দুটি চোখ।
সুমিতা দেবী মনের দুঃখ ঢাকতে নাতনির নাম রাখলেন মৃগনয়নী। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন প্রবাদটির মতো, তা নয়। বড় হতে হতে শিশুর মুখের অনেক অদল বদল হয়। সেই আশাতেই এ নাম রাখা। যদিও মায়ের কাছে সে তুলতুলি।

বছর তিন পরে মৃগনয়নীর ভাই হয়। জন্মের পর যারা দেখতে এসেছিল সবাই বলে ওমা! এ তো পুরো মায়ের চোখ।
কোনো রাখ ঢাক না রেখেই তুলতুলির সামনেই লোকজন বলতো মেয়ের চেয়ে ছেলের চোখ দুটি সুন্দর। পুরো মায়ের মত।
যে বয়সে কষ্ট ভাষার দ্বারা প্রকাশ পায় না, বরং জেদ, উল্টে দুর্ভোগ দিয়ে প্রকাশ পায় শিশু মনের অজান্তেই, সেই বয়সে মেয়ের বদ্ধ পরিকর ধারণা হয়ে গেলো তার মা সুন্দর, ভাই সুন্দর কিন্তু সে নিজে সুন্দর নয়। একদিন বাবাকে তুলতুলি বললো ' তোমরা সবাই মা কে বেশি ভালোবাসো। আর ভাইকে। ওদের কত্ত সুন্দর চোখ!'

রুদ্র মেয়ের মুখে এই কথা শুনে রাগই করলো। এতটুকু বাচ্চার মনে এই ধারণা হবে কেন? সোজা স্ত্রীর কাছে গিয়ে জানতে চাইলো 'কেন মেয়ের এরকম মনে হয়েছে আজ রাতের মধ্যে জেনে তুমি আমাকে বলবে আর ওর মাথা থেকে এইসব বার করবে। এত ছোট্ট বয়সে এত হীনমন্যতা গ্রাস করবে কেন?'
রাতে অপর্ণা মেয়েকে নিয়ে শুতে এসে আদর করে জিজ্ঞেস করলো 'তুমি বাবাকে বলেছ তোমাকে দেখতে ভালো না? কেন বললে? কে বলেছে তোমাকে?'
তুলতুলি মায়ের দিক থেকে মুখ সরিয়ে বললো 'আমি জানি। সবাই তো তাই বলে। ঠাম্মাও বলে।'
'কাকে বলে?'
'সরস্বতী পিসিকে। বলেছে ছেলের মতো চোখ দুটো মেয়ে পেলে কাজে দিত।'
অপর্ণা মেয়েকে বুকে টেনে বলে হাসির ছলে 'তুলি তোর মায়ের চোখ দুটো সুন্দর? তোর তাই মনে হয়? আমার তো মনে হয় ভীষণ বেমানান জগন্নাথের মতো গোল গোল!'
'না মা আমার বন্ধুরা বলে তোর মায়ের চোখ দুটো খুব সুন্দর গরুর মত। আমার রাগ হয় বললে। কিন্তু স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা গরু দেখলাম কত্তো সুন্দর চোখ।'
'এবার যদি কেউ তোমাকে এরকম বলে তুমি বলো তুমি তোমার বাবার মত দেখতে। বাচ্চারা বাবা, মা, মামা, পিসি যে কারো মত হতে পারে। যারা হিংসে করে না, সবাইকে ভালোবাসে, মন দিয়ে পড়ালেখা করে তাদের ভিতরের সুন্দর মনটা তাকে বাইরে থেকে সুন্দর করে। ছোট চোখ বড় চোখে কিচ্ছু হয়না মা।'

মায়ের কথাটাই ঠিক কিছুদিনের জন্য মেনে নিলো তুলতুলি। সেই থেকে ভাইয়ের প্রতি একটা ভালোবাসা জন্মালো মেয়ের। অপর্ণাও মেয়ের দায়িত্বে ছেলেকে রেখে টুকটাক কাজ করতে যেত। যাতে ভাইয়ের প্রতি একটা টান একটা দায়িত্ব বোধ জন্মায়।

শৈশব মানুষের আজীবন থাকে না। কৈশোর কখনও কখনও কানাঘুষো বলে যায়, পড়ালেখায় সে ভালো কিন্তু চোখ দুটো মায়ের মতো নয়। বন্ধুদের বৃত্তে এর ওকে ভালোলাগা, ক্রাস নিয়ে কত আলোচনা। তুলতুলির বদ্ধ ধারণা সে সুন্দর নয়। ইচ্ছের পরিধি বড় করে লাভ নেই। জীবনে কাজের কাজ করার অনেক কিছু আছে। মেয়ে বন্ধুরা যখন গোপন চিঠি আর দেখা করা নিয়ে আলোচনা করে তখন সে তাদের থেকে আরেকটু ছোট বন্ধুদের ভাইদের সঙ্গে বা নিজের ভাইয়ের বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে পাড়ার মাঠে। অপর্ণা খুঁজতে আসে তুলতুলির বন্ধুদের কাছে। দেখা যায় সে সেখানে নেই। ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে টাগ অফ ওয়ার খেলে গায়ে হাতে কালি ঝুলি মেখে বসে আছে।

একবার সুমিতা দেবী নাতনিকে নিয়ে দেশের বাড়ি গিয়েছিলেন। তখন নাতনির বয়স ষোলো সতেরো।
পাশের গ্রামের ঠাকুর বাড়ির বংশধর দেবেশ কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে।
সুমিতা দেবীর বন্ধুর নাতি। সুমিতা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তার ঠাকুরমার সঙ্গে। তুলতুলিকে দেবেশের বেশ ভালো লাগলো। কিন্তু সুমিতা দেবীর বন্ধুর সঙ্গে কথপোকথনে তার পুরোনো আক্ষেপ আবার চারা দিল।
'সুন্দর দেখতে হয়েছে রে সুমি তোর নাতনি'
'মায়ের চোখদুটি পায় নি। পুরো বাপ।'
দেবেশ পরদিন তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলে গেল তুলতুলিকে। তার আবিষ্কৃত যন্ত্র পাতি দেখাবার প্রতিশ্রুতিও দিলো। কিন্তু সে দেবেশকে বলে দিল পরদিন তার পক্ষে সম্ভব হবে না কারণ নারায়ণ কাকা তাকে কথা দিয়েছে নতুন সেচ ব্যবস্থা দেখাতে নিয়ে যাবে।
কখনও কখনও তুলির মনে হয় তার চোখ সুন্দর নয় বলে তাকে লোকে বিশ্বাস কম করে। একদিন স্কুলে ল্যাবরেটরিতে একটি মিথ্যে অভিযোগে তাকে অনেক কথা শুনতে হয় তার শিক্ষিকার কাছে। গার্জেন কল হয়। অপর্ণা দেখা করে পুরোটা বুঝিয়ে বলাতে শিক্ষিকা মেনে নেন যে ভুল তার নয় বরং অন্য সহপাঠীর। কিন্তু এরকম হবে কেন মনে হয় তার। শিক্ষিকা কেন তার কথা বিশ্বাস না করে তার মায়ের কথা বিশ্বাস করবে? সুন্দর চোখ বলে? সে তো মিথ্যে বলেনি। তার মুখ থেকে শোনা কথা তার মাকে গিয়ে কেন স্কুলে বলতে হবে? কেন বিশ্বাস হবেনা যে ভুল তার নয়।
যে ভাগ্যগত কারণে সে কারো কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়, তখন তার কোনও দায় নেই নিজেকে প্রমাণ করার। কিন্তু প্রমাণ জড়ো করা থাক। কখনও দাখিল করার জন্য, কখনও বা নিজে নিজের কাছে পরিষ্কার থাকার জন। মনের কোণে সবসময় একটা আফসোস জেগে থাকে। যদি মায়ের মত চোখ দুটো সে পেত তাহলে অনায়াসে সবাই তাকে বিশ্বাস করতো।

এমন ধারণা নিয়ে বড় হতে হতে অনেকটাই বড় হল তুলতুলি। মায়ের মুখের সঙ্গে তুলনা শুনতে শুনতে এমন হয়েছে যে কেউ যদি তাকে সুন্দর বলে তার তা পছন্দ হয়না। মনে হয় তাকে ইঙ্গিত করছে সে বড় বোকা। এভাবেই নিজেকে সকলের সঙ্গে মিশে অথচ নিজেকে সরিয়ে রেখে বড় হল তুলতুলি। মা কে সে ভালোই বাসে। কিন্তু চারপাশের মানুষজন তুলনা টেনে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে যার বাইরে বেড়িয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু ভাগ্য মৃগনয়নীর জন্য অন্য কিছুই লিখে রেখে দিয়েছিল। ট্রেনে যেতে যেতে এক নানের সঙ্গে আলাপ হয় । সেই নান কিছু দৃষ্টিশক্তি হীন ছেলেমেয়েদের নিয়ে
যাচ্ছিলেন মেঘালয়ে। সেখানে ওদের দশদিনের ক্যাম্প। ওদের পড়ালেখার ধরন দেখে মৃগনয়নীর ভালো লাগলো। সাধারণ জ্ঞানের বই তে পড়া ব্রেইল আসলে কেমন, কী কাজে লাগে, কীভাবে কাজে লাগে সব মন দিয়ে দেখার সুযোগ আসে তার। কলকাতা ফিরে ব্রেইল শিখতে শুরু করে সে। শোনা যায় তার ছোট অনাকর্ষণীয় চোখদুটি সার্থক হয়েছে অগণিত দৃষ্টি শক্তি হীন ছেলেমেয়েদের মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে। অপর্ণা তার সুন্দর দুটি চোখ নিয়ে সংসারের মধ্যে কায়িক পরিশ্রম করে গেছে আজীবন। মৃগনয়নী তার বিশ্রী চোখ দিয়ে শ্রী ফিরিয়েছে আশাহীন অনেকগুলি জীবনের। এখন আর সে মায়ের সঙ্গে তোলা ফটো দেখে গোপনে চোখের জল ফেলেনা। বরং হাসে।
এ হল জীবনের গল্প, বাস্তব আর স্বতন্ত্র পরিচয় গঠনের গল্প, যুক্তির বাইরে মুক্তির গল্প।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com