গল্প - আমার এই পথ
প্রতি বছরই শ্রুতি বসন্ত উৎসবের সময় কয়েকটা দিন শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যায় । দীর্ঘ পনেরো বছরের এই অভ্যাস মজ্জাগত হয়ে গিয়েছে । বিয়ের আগে মা বাবার সাথে যেতো । এখন স্বামী এবং কিশোরী মেয়ে শ্রাবণী ভ্রমণের সঙ্গী । শ্রুতি একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা । স্বামী পলাশও সরকারি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা । স্বচ্ছল পরিবার এবং আদ্যোপান্ত সাংস্কৃতিক মনষ্ক । মেয়ে শ্রাবণী উচ্চমাধ্যমিক পড়ছে ।
কলকাতার জোড়াসাঁকো তে নিজেদের বাড়ি শ্রুতির । স্বামীর পূর্বপুরুষের বাড়ি । অর্থাৎ শশুর বাড়ি । বেশ পুরাতন বাড়ি হলেও এখনও শক্তপোক্ত মাঝারি দোতলা বাড়ি । শ্রুতির নিজের মা - বাবা থাকলেও , শশুর বেঁচে নেই । বৃদ্ধা শাশুড়ি থাকেন এক তলায় । বাড়ির সামনে পাঁচিল দেওয়া ছোট্ট বাগান । বাগানে কোনো বড় বড় গাছ না থাকলেও , সব ধরনের মরশুমী ফুলের গাছে ভর্তি । দৈনিক বাড়ির পুজোর ফুল পারতপক্ষে কিনতে হয় না । বাগান থেকেই পাওয়া যায় । বাহারি ফুলের সাজানো বাগানে রুচির ছাপ স্পষ্ট । শ্রাবণী দেখভাল করে ।
কবির পাড়ায় বাড়ি , তাই শ্রুতি এবং পলাশ যথেষ্ট যত্ন করে। , মেয়ে শ্রাবণী কে আধুনিক পড়াশুনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মনষ্ক করে তুলেছে । শ্রুতির , স্বামী এবং মেয়ে কে নিয়ে ছোট্ট সংসারে সুরের তাল কাটতে দেয় না । কারণ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আদর্শে তিনজনেই দীক্ষিত ।
শনি এবং রবিবার তো এমনিতেই ছুটি থাকে । পলাশ এবং শ্রাবণী মোট সপ্তাহ খানেকের ছুটির ব্যবস্থা করে , ঠিক করলো পয়লা মার্চ শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে । ফিরে আসবে আট তারিখে । শান্তিনিকেতনে তেসরা মার্চ থেকে বসন্ত উৎসব শুরু হবে ।
প্রতি বছরই যেহেতু শান্তিনিকেতন এই সময়তেই শ্রুতিরা যায় , তাই ওখানে চেনাজানা হোটেলে খুব ভালো পরিচিতি আছে । ওরা সকলে শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরবে বলে হাওড়া স্টেশনে এসে উপস্থিত হলো । এই ট্রেন খুবই দ্রুত বোলপুর পৌঁছিয়ে দেবে । ছাড়বে সকাল দশটায় ।
শ্রুতিরা ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই বোলপুর পৌঁছিয়ে গেলো । হোটেলে সকলেই আমাদের খুবই পরিচিত বলে ভালো ঘর পেতে অসুবিধা হলো না । অবশ্য আগে থেকেই ফোনে বুকিং করা ছিল ।সকলে দ্রুত "চেক ইন" করে হোটেলের ঘরে পৌঁছিয়ে গেলো । কবিগুরুর আশ্রম দর্শনে শান্তনিকেতনে আসা । তাই খাওয়া দাওয়ার বিশেষ আড়ম্বর ছিলোনা । দুপুরের আহার শেষ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলো পরিবারের সকলে ।
বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি নিয়েই শ্রুতি, শ্রাবনীরা এখানে এসেছে । শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব হলো রঙ , গান ও প্রকৃতির এক অনন্য মিলনমেলা , যা মূলত কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত বসন্ত ঋতুকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব । দোলপূর্ণিমার দিনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই উৎসবে , হলুদ পোশাকে সেজে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে এবং একে অপরকে আবির মাখিয়ে বসন্ত উৎসব উদযাপন করে । এ এক স্বর্গীয় অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা ।
শ্রুতির এবং শ্রাবণী ঠিক করেই নিয়েছিল এই আনন্দের পুরোটাই তারা উপভোগ করবে এবং এই অভিজ্ঞতা তারা তাদের স্মৃতির মণিকোঠায় চিরদিনের জন্য সাজিয়ে রাখবে ।
তেসরা মার্চ একদম সকালেই শ্রুতি এবং শ্রাবণী বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলো । পলাশ নিজেও হলুদ পাঞ্জাবি এবং সাদা পাজামা পরে সকলের সঙ্গে অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে উঠল । শুরু হলো আশ্রম পরিক্রমা , রবীন্দ্র সংগীতের তালে , নৃত্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে । পরিচিত দৃশ্য হলেও পলাশ মুগ্ধ হয়ে শ্রুতি এবং শ্রাবণীর নৃত্য শৈলীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে আনমনা হয়ে গেলো । অংশগ্রহণকারীরা সকলেই জানে এটি কেবল হলি খেলা নয় , বরং ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার একটি উৎসব , যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে প্রবর্তন করেছিলেন ।
বসন্ত উৎসব কে কেন্দ্র করে শান্তিনিকেতনের আশেপাশে লোকশিল্প , হস্তশিল্প প্রদর্শনী এবং বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন থাকে ।
হোটেলে ক্লান্ত , অবসন্ন শরীরগুলোকে বয়ে নিয়ে শ্রুতি , শ্রাবণী এবং পলাশ ফিরে আসছিল । হঠাৎই কিছু নেশাগ্রস্ত যুবক এগিয়ে এসে শ্রুতি এবং শ্রাবণী কে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ইঙ্গিত এবং অভব্য ব্যবহার করতে লাগলো । দুজনেই আকস্মিক এই ঘটনায় যার পর নাই আতঙ্কিত হয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো । অসহায়ের মতো পলাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করতে লাগলো ।
পলাশ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ওই মদ্যপ যুবকদের সাধ্যমতো ঠেকাতে লাগলো । মেয়ে শ্রাবণী খুবই সাহসী । সে রাস্তা থেকে ইটের টুকরো নিয়ে পাগলের মত ওই মদ্যপ যুবকদের দিকে ছুঁড়তে লাগলো । ইতিমধ্যে আশেপাশের লোকজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো । বেগতিক দেখে মদ্যপ যুবকরা পালিয়ে গেলো ।
শ্রুতি হঠাৎ লক্ষ্য করলো পলাশ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে আছে অসহায়ের মতো । পাগলপ্রায় শ্রুতি এবং শ্রাবণী পলাশকে বোলপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এলো । স্থানীয় পুলিশের সাহায্য নিয়ে ভর্তি করতে অসুবিধা হলো না পলাশ কে ।
কিন্তু বোলপুর হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ছিল না । খুব দ্রুত পলাশ কে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে আসা হলো অ্যাম্বুলেন্সে ।
পলাশের ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে । ডাক্তারেরা সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগলো । চারদিন জীবন মৃত্যুর সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে পলাশ চিরদিনের জন্য চলে গেলো ।
সময়ের সাথে সবকিছুর স্মৃতি ফিকে হয়ে যায় । শুধু শ্রাবণী এবং শ্রুতির কাছে আজও পলাশ জীবন্ত হয়ে আছে । বাড়ির বাগানে এখনও আগের মতো ফুল ফোটে । কিন্তু সেই ফুলে উজ্জ্বল রঙ এবং সুগন্ধ কোনোটাই শ্রুতির কাছে ধরা দেয় না । পলাশ সুগন্ধ এবং রঙ , শ্রাবণী এবং শ্রুতির জীবন থেকে নিয়ে চলে গেছে । অবসরে শ্রুতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "মরণ" কবিতাটি মনে মনে আবৃত্তি করতে থাকে -
মরণ রে তুহু মোমো শ্যামসমান ।
মেঘবরণ তুঝ , মেঘ জটাজুটো ,
রক্ত কমল কর , রক্ত অধর - পুট ,
তাপ - বিমোচন করণ কোর তবে
মৃত্যু - অমৃত করে দান !
তুহু ম ম শ্যমসমান ।
মরণ রে , শ্যম তোহারি নাম ।
চির বিসরল যব নিরদয় মাধব
তুহু ন ভইবি মোয় বাম।
আকুল রাধা রিঝ অতি জরজর,
সরই নয়ন দউ অনুখন ঝরঝর ।
তূহু মম মাধব , তুহু মম দোসর ।
তুহু মম তাপ ঘুচাও ।
মরণ রে , তু আও রে আও ।
ভূজো পাশে , তব লহ সন্মধই
আঁখিপাত মোঝু দেহ তু রোধই।
করো - উপর তুঝ রদই
মঝু - জীবন - অবসান ।
তুহু মম শ্যামসমান ।
