গল্প - ফিরে আসা কবিতা
চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা এবং চুলে হালকা সাদা ছোঁয়ায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির ব্যক্তিত্ব সুদীপ্ত মুখার্জী। দুর্গাপুর কলেজের বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক হিসেবে এবং ভালো লেখক হিসেবে এক সু-পরিচিত নাম। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় তিনি।
বাংলা সাহিত্য ছন্দে,ভাবে কবিতাময় হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটা কিন্তু এই মুহূর্তে এক ছন্দহীন কবিতা। মন আজকাল তাঁর বড়ই নিঃসঙ্গ থাকে, একাকী লাগে জীবন। এই নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব ঠিক এক শীতকালীন শুষ্ক বিকেলের মতই-- অভিমান ভরা, যা বছরের পর বছর ধরে তাঁর হৃদয়ের গভীরে এক কোণে জুড়ে আছে।
তাঁর কবিতার খাতাটাও বহুদিন যত্নের অভাবে আজ ধুলোমাখা, মলিন। সেই খাতার প্রতিটা পাতা জুড়ে আছে কিছু অব্যক্ত কথা-- একটি মাত্রই নাম সেখানে ঈশানী। এই নামটি স্তব্ধতার গহ্বর ভেদ করে ছিল যেদিন, তাঁর কবিতার প্রতিটা ছত্রে ছত্রে।
সেই দিন ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর ক্লাস করতে গিয়ে টের পেল, আজ স্যারের ক্লাসে কিছু একটার অভাব রয়েছে। সেই চেনা সুদীপ্ত স্যার বড্ড অচেনা। তিনি আজ বেশ অন্যমনস্ক। হাসিখুশি ভাবটাও যেন আজ অনুপস্থিত।
ক্লাস শেষ করে স্টাফ রুমে ঢুকতেই এক চেনা গন্ধ হঠাৎ তাঁর নাকে এসে লাগলো--- দশ বছর আগের সেই পরিচিত গন্ধটা। তাহলে কি?
থমকে দাঁড়ালেন সুদীপ্ত,-- এক চেনা আওয়াজ, চেনা মুখ!
সত্যিই কি? এত বছর পর?....
ঈশানী!
অতিথি অধ্যাপক হিসেবে এসেছেন অন্য কলেজ থেকে তাঁদেরই কলেজে কিছু দিনের জন্যে।
চোখে চোখ পড়ল ঠিকই। কিন্তু কোথাও যেন অনুভূতির সেই চেনা স্পর্শটা আজ চোখে আঙুল দিয়ে বারবার দেখাতে চাইছে--- সে অনুপস্থিত।
দুজনাই মুখ ঘুরিয়ে রইলেন। এক নিঃশব্দতা,অদ্ভুত নীরবতা দুজনের মাঝখানে সীমারেখা টেনে রাখল সেদিনের জন্যও।
সন্ধ্যেবেলা কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরে সুদীপ্ত যখন ১০ বছর আগের ঘটনাগুলোকে নিয়ে নিজের ক্ষতবিক্ষত মনের সাথে যুদ্ধ করছেন, ঠিক সেই সময় মেইল ইনবক্সে এলো একটি বার্তা। "লাইব্রেরীর পেছনের বাগানে বিকেল ছটায় একবার দেখা করা যাবে? আসবি তুই?"
তৎক্ষণাৎ মেলের উত্তর না দিলেও সুদীপ্ত সেদিন মনে মনে কিন্তু চাইছিলেন ঈশানীর সঙ্গে এত বছর পরে একটু সময়ের জন্য একবার, অন্তত একান্তে দেখা হওয়াটা দরকার, বড্ড জরুরী। অনেক না বলা কথা জমে আছে মনের কোনে, হৃদয়ের গভীরে।
সুদীপ্ত সময়মতই সেখানে পৌঁছিয়ে দেখলেন ঈশানী তাঁর অপেক্ষায়। হলুদ-সবুজ শাড়িতে সেদিন ঈশানীকে ভারী সুন্দর দেখতে লাগছিল। এই এতগুলো বছরে ঈশানী যেন আরো সুন্দরী, আরো সপ্রতিভ।
বসন্তের নরম আলো গায়ে মেখে ঈশানী পাশে এসে বসল।
"জানিস, বসন্ত এখনো আমার প্রিয় ঋতু"...
সুদীপ্ত মুগ্ধ হয়ে ঈশানী কে দেখছিলেন সেই মুহূর্তে। একটু মৃদু হেসে জবাব দিলেন,
" আমার প্রিয় ঋতুর নাম ছিল এতদিন শুধুই অভিমান। তাই তো নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম।"
দুজনের মাঝে কিছুক্ষণের জন্য নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা।
" জানিস তোর হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলো আমি রোজ গোপনে বাঁচিয়ে রেখেছি.... যত্নে, ভালোবাসায়। তুই যে আমার মৌনতার ভাষা।" ঈশানী সুদীপ্তর চোখে চোখ রেখে মৃদুস্বরে বলে ওঠে।
" আর তুই, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া কবিতাগুলো ঈশানী, যাদের ছাড়া আমার কলম যে আজ স্তব্ধ!"
আকাশে হালকা মেঘ, পাশের গাছে মাঝে মাঝে ভেসে আসা কোকিলের সুরেলা কলতান, চারপাশের পরিবেশটিও আজ সোনালী আলোয় মাখামাখি, বড়ই অচেনা। বাতাসে ভেসে আসছে এক অজানা সুবাস।
"আচ্ছা সুদীপ্ত, তোর কবিতাগুলো কি আজও আগের মতই কথা বলে?"
সুদীপ্ত আবারও নীরব। খানিক পরে এক দীর্ঘশ্বাস ভেদ করে উত্তর বেরিয়ে আসে---
"না, ওরা তো তোর সাথে সেদিনই চলে গিয়েছিল।" হৃদয়ের এক অনুচ্চারিত কান্না, এক নীরব অতীতের আগুন আবারও যেন জেগে উঠল।
কিন্তু হঠাৎ এক দমকা হওয়ার মতো নিঃশর্ত স্পর্শের ছোঁয়া এবং ভালবাসার দাবী নিয়ে প্রেমের এক গোপন সুর সেদিন আছড়ে পড়ল দুজনার মাঝখানে।
"তবে এবার তাহলে বসন্তকে কাছে ডেকে নে সুদীপ্ত...
তার কবি যে আজও অপেক্ষায়....."
"ঈশানী!"...
ঈশানী রয় ও সুদীপ্ত মুখার্জী আজ দশ বছর পর আবারও দুজনে দুজনার কাছাকাছি। একে অপরের মুখোমুখি।
কিন্তু আজ সময় কথা বলছে... গোপন প্রেম তাদের দুজনকে আজ এক করতে কোথাও যেন উদ্যত।
ঠিক সেই মুহূর্তে কলেজের ঘড়ির ঘন্টাটাও বেজে ওঠে যেন ঈশানীর কথাতেই সায় দিয়েই---- ঠিক, ঠিক, ঠিক....
সন্ধ্যে নামার মুহূর্ত, কিন্তু আজ এই দুজন মানুষের চোখে মুখে এক নতুন খুশির আলো ছড়িয়ে পড়েছে বহু বছর পরে।
"কথা দে, এবার বসন্তের কবিতা একসাথে লিখব, এক ছাদের তলায়"--- ঈশানীর কন্ঠে খুশির সুর উপচে পড়ে।
সুদীপ্তও তৎক্ষণাৎ হেসে জড়িয়ে ধরেন ঈশানী কে, "শর্ত কিন্তু একটাই। শ্রোতা হব কেবল আমি, আজীবনভর।"
দুজনার চার হাত এক হয়ে বয়ে আনে প্রেমের স্পন্দন। যেখানে কান পাতলে পাতার মৃদু খসখসানি শব্দের সাথে শোনা যায় ফিরে আসা গোপন কবিতার এক নতুন বার্তা,...
" বসন্ত এসে গেছে।"
