গল্প - নীরব স্বীকারোক্তি
শহরটা তখন নতুন। নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব। মেঘলার জীবনে যেন এক অচেনা অধ্যায়ের সূচনা। সেই অধ্যায়েরই এক নীরব চরিত্র—আরিয়ান।
অফিসের ভিড়ে প্রথম দিনই তাকে আলাদা করে চোখে পড়েছিল। খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার নীরবতায় ছিল এক অদ্ভুত আশ্রয়। কাজ শেখাতে শেখাতে কখন যে দু’জনের মধ্যে অদৃশ্য এক সেতু তৈরি হয়ে গেল, তারা কেউই টের পায়নি।
দুপুরের চায়ের কাপের ধোঁয়া, ক্লান্ত বিকেলের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা, ফাইলের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট হাসি—এই সামান্য মুহূর্তগুলোই একদিন অস্বীকার করা যায় না এমন অনুভূতিতে রূপ নিল।
তবু সেই অনুভূতির ওপর ছিল বাস্তবতার কঠিন ছায়া।
আরিয়ানের সংসার ছিল। দায়িত্ব ছিল। সামাজিক পরিচয় ছিল। আর মেঘলা জানত—ভালোবাসা শুধু হৃদয়ের বিষয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক জীবনের সমীকরণ।
তারা কখনো সীমা অতিক্রম করেনি। হাত ধরেনি, প্রতিশ্রুতি দেয়নি, ভালোবাসি বলেনি। অথচ না বলা সেই শব্দটাই তাদের মাঝখানে প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
এক বর্ষার সন্ধ্যায়, অফিস ফাঁকা। জানালার কাঁচে বৃষ্টির রেখা। মেঘলা ধীরে বলেছিল—
“সব অনুভূতির কি কোনো নাম দরকার?”
আরিয়ান দীর্ঘ নীরবতার পর বলেছিল—
“যে অনুভূতির নাম দিলে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায়, তাকে নাম না দেওয়াই ভালো।”
সেদিন তাদের চোখে জল ছিল না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দু’জনেই জানত—এই প্রেমকে স্বীকার করা মানেই অনেক কিছু হারানো।
তারপর থেকে দূরত্ব বেড়েছে। ইচ্ছে করেই কথা কমানো, চোখ সরিয়ে নেওয়া, হাসিকে আটকে রাখা। যেন নিজের হৃদয়কেই শাসন করা।
কয়েক মাস পর মেঘলার বদলি হয়ে গেল। বিদায়ের দিন অফিসের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আরিয়ান শুধু বলেছিল—
“নিজের খেয়াল রেখো।”
এই চারটি শব্দের আড়ালে্ লুকিয়ে ছিল হাজার অপ্রকাশিত বাক্য l
