গল্প - বকুল ফুলের গন্ধ
" গ্রীষ্মের পথভোলা পাখিরা আমার জানালায় এসে গান গায় আর উড়ে যায়।
আর শরতের হলুদ পাতা যাদের কোন গান নেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেখানে ঝরে পড়ে।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
( Stray Birds)
গ্রীষ্মের বিকেলটাও কেমন যেন গুমোট থাকে, আকাশে মেঘ থাকলেও আবহাওয়াটা যেন বড্ড ভারীক্কি। এই অবস্থায় ঘরে থাকতে ইচ্ছে করলো না অবনীবাবুর। বইয়ের পাতাটা বন্ধ করে আশ্রমের বাগানে বকুল গাছের নিচে এসে বসলেন তিনি একটি চেয়ার নিয়ে। মনে মনে তার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তিটি আওড়াতে আওড়াতে।
কাজের সূত্রে অবনী বাবুর মাঝে মাঝে শান্তিনিকেতনের এই আশ্রমটিতে আসতে হয়। এবারে যেন বড্ড গরম পড়েছে। কিন্তু বিকেলের দিকে এই ঝাঁকড়া বকুল গাছের নিচে বসার জায়গাটা তাঁর বড্ড প্রিয়।
এক অদ্ভুত শান্ত, নীরব, আর কি ঠান্ডা জায়গাটা। কিছুক্ষণ বসে থাকলেই মন-প্রাণ যেন জুড়িয়ে যায়। তিনি শুনেছেন, রবীন্দ্রনাথেরও নাকি এরকমই এক ঝাঁকড়া বকুল গাছের নিচের বসার জায়গাটা বড্ড প্রিয় ছিল। আর এই সময়টাতে তাঁর এই প্রিয় বকুল ফুল চারিদিকে ছড়ানো থাকে, তার যে কি সুবাস চারিদিকে।
ঠিক সামনে খোলা জায়গাটাতে হরিপদ মালি একমনে গাছের পরিচর্যা করে চলেছে। বয়স হয়েছে, শরীরটাও ঠিক সায় দেয় না আগের মত। কিন্তু কি নিষ্ঠা কি ভালোবাসা, এই গাছগুলোর প্রতি, ঠিক যেন তার নিজেরই সন্তান। ঠিক সেই ভাবেই সে বছরের পর বছর তাদের যত্ন নিয়ে চলেছে।
হঠাৎ এক নতুন কর্মচারীকে হরিপদর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। নতুন এক সাংস্কৃতিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভদ্রলোক। সদ্যই যোগ দিয়েছেন।
তিনি হরিপদ কে এগিয়ে এসে বললেন, "এত কষ্ট করে লাভ কি বলতো? এই যে তুমি এই বৃদ্ধ বকুল গাছটাতে যত্ন করে পাতা ছেঁটে দাও। তার আশেপাশের মাটি ভিজিয়ে দাও। কি হবে এতে?
কজন এই বৃদ্ধ গাছটাকে, ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলোকে মনোযোগ দিয়ে দেখে?"
হরিপদ কোন উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে এক মনে নিজের কাজ করে যেতে লাগলো।
অবনীবাবু কথাটা শুনে হরিপদর কাছে এগিয়ে এলেন।
মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকটি বকুল ফুল হাতে নিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন,- " তুমি কি এই ফুলের গন্ধ পাচ্ছ?" লোকটি বলল, "হ্যাঁ।"
"কখনো কি দেখেছ যে, ফুল কাউকে ডেকে বলছে আমার গন্ধ নাও?"
লোকটি অবাক হয়ে মাথা নাড়ে।
অবনী বাবু বলে চলেন, "তবু সে নীরবে সুবাস বিলিয়ে যায়। কারণ দেওয়াটাই তার স্বভাব।"
সন্ধে নামছে, অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে, বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে।
অবনী বাবু আবারও বলেন,
" মানুষের কাজও ঠিক তেমনি হওয়া উচিত। প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের কর্তব্যের আনন্দে কাজ করাটাই মুখ্য।"
হরিপদর চোখ দুটো জলে ভিজে উঠেছে। সেও অনুভব করে তার শ্রম বৃথা যায়নি।
পরদিন ভোরে দেখা গেল, আশ্রমের সেই পথটুকু বিছিয়ে আছে বকুল ফুলে, যেখানে এক বৃদ্ধ মালির নীরব ও সন্তানস্নেহ ভালবাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝাঁকড়া এক পুরনো বকুল গাছ।
ছাত্র-ছাত্রীরা হাঁটতে হাঁটতে কেউ কেউ সেই বকুল ফুল কুড়িয়ে নিল। কিন্তু কেউ জানল না এই ফুলের সৌরভ ও সৌন্দর্যের পেছনে এক বৃদ্ধ মালির অবদানের কথা। জানতো শুধু বকুল গাছ আর অবনী বাবু।
ঠিক সেই মুহূর্তে যখন বকুল ফুলের সৌরভের সাথে ভোরের গন্ধে প্রকৃতি মাখামাখি, আশ্রমের ভেতর থেকে ভেসে এলো এক কণ্ঠ...
" তটের চরণে তটিনী ছুটেছে,
ভ্রমর লুটিছে ফুলের বাস--
সেঁউতি ফুটিছে, বকুল ফুটিছে,
ছড়ায়ে ছড়ায়ে সুরভিশ্বাস।"....
