প্রবন্ধ - ঋতুবৈচিত্রের মাঝে রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে প্রাণের স্পন্দন তা রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় গভীর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির সান্নিধ্য ছাড়া মানুষের আত্মার বিকাশ সম্ভব নয় ।প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকলে তবে জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় । তাঁর গল্প, নাটক, উপন্যাস, কাব্য সর্বত্রই ছিল প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর লেখা " ছিন্নপত্র " কবিতাটি পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি যেখানে কবির ব্যক্তিগত জীবনের অনুভূতি মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখকে পর্যবেক্ষণ করে দৃশ্যাবলি ঘটনা এমন ভাবে চিত্রিত করেছেন যা থেকে বোঝা যায় কবি ছিলেন দার্শনিক চিন্তাধারার এক জীবন্ত দর্পন ।
কবি বলেছেন সৃষ্টির আদি লগ্নে পৃথিবীর প্রাণ সঞ্চার হয়নি । পৃথিবীর বিশাল জলরাশির মাঝে তিনি এক তৃণ রূপে গাছের পাতা হয়ে পৃথিবীর বুকে জন্ম গ্রহণ করেছেন । সূর্যের আলোতে তার প্রাণ সঞ্চার হয়েছে । সৃষ্টি চক্রের মধ্য দিয়েই উন্নত মানব জীবন গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর সাথে তাঁর বহুকালের পরিচয় তাই পৃথিবীর প্রতি তার এতো আকর্ষন। রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি এক জীবন্ত সত্তা । বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে আলো, বাতাস, মেঘ, বৃষ্টি, ফুল , তরুমূল, ঋতুচক্র এই সব কিছুই তাঁর সৃষ্টির মধ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে । তাঁর লেখা ৬ টি পর্যায়ের গানের মধ্যে প্রকৃতি পর্যায়ের গানগুলি অন্যতম । প্রকৃতি পর্যায়ের গানে তিনি মেঘমল্লার , বসন্তরাগ , বিভাস, ইমন , বেহাগ, ভূপালী, কাফি, ভৈরবী রাগের ব্যবহার করেছেন :
" আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ "---
এই গানটির মধ্যদিয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রকৃতি যে তার রূপ বদলায় রোদ- ছায়ার লুকোচুরির মাঝে বর্ষা ও বসন্তের আবির্ভাব যার মধ্যে জীবনের আসল তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যায় তা তিনি প্রতিটা মুহূর্তে উপলব্ধি করেছেন।
কালবৈশাখীর প্রতিক্ষায় তিনি লিখেছেন :
" দারুণ অগ্নি বানে রে" --- আসলে গ্রীষ্মের দহন জ্বালার মধ্যেদিয়ে বিশ্ব জগৎ এর কল্যাণময় রূপটি উন্মোচন করেছেন। গ্রীষ্মের দাবদাহে তপ্ত পৃথিবীকে স্নিগ্ধতা এনে দেয় বর্ষা। তাই বর্ষা কখনও প্রেমের ঋতু আবার কখনও বিরহের ।
তিনি দেবাদিদেব মহাদেবকে মহাকালের বিভিন্ন রূপের সাথে বর্ণনা করেছেন। বৈশাখে তিনি তপস্বী রূপে আবার শরতে ভোর বেলার শিউলি ফুলের রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। নির্মল আকাশ, শিউলির ঘ্রাণ, কাশফুল যা কবির গানের মূল প্রেরণা :
" শরতে আজ কোন অতিথি "-----
" শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি "---
হেমন্তে তিনি পাকা শষ্যের মধ্যে বিচরণ করেন। তাই তাঁর গানগুলো মূলত নবান্নের উৎসব ঘিরে রচিত :
" হিমের রাতে ঐ গগনের দীপগুলিরে "----
" জীবন যখন ছিল ফুলের মতো "-----
শীতে তিনি রুদ্র সন্ন্যাসীর নবতর জীবনের ভূমিকায় । জীর্ণতার মাঝে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ ও শান্ত রূপটিকে আরো মোহময় করে তুলেছেন :
" শীতের হাওয়ার লাগল নাচন "------
বসন্তে তাঁর তপস্যা যৌবন রসের বার্তা বয়ে আনে :
" আহা আজি এ বসন্তে "----
" ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় "-----
" রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও"-----
বসন্ত উৎসব এর মধ্য দিয়ে জরাজীর্ণ শীতকে বিদায় জানিয়ে গাছে গাছে নতুন পাতায় , রঙিন ফুলের সাজে প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠে ।প্রকৃতির প্রতি মানুষের যে দায়বদ্ধতা তা মনে করিয়ে দিতে
কবিতা, গান, প্রবন্ধের মধ্যে তিনি তাঁর আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিগুরু মনে করেন প্রকৃতি থেকে দূরে সরে গেলে মানুষের জীবন মরুভূমি হয়ে যায় । প্রকৃতির মাঝেই মানুষের মুক্তি । তিনি মনে করেন বিচ্ছিন্নতায় মুক্তি আসে না ; বরং আলো , বাতাস, ধূলোবালি মানুষের দুঃখ - কষ্টের মাঝে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় যা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে বিরাজমান। তাই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে --
" আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে
আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসের ঘাসে "।।
