গল্প - প্রতিবাদ
ওরা পাঁচজন এখন জীবন জীবিকায় ব্যাস্ত । স্কুল জীবন থেকেই আকাশ , সমীর , ভাস্কর , সলিল এবং ক্ষিতি অভিন্ন হৃদয় বন্ধু । কলেজ জীবনেও একসাথে কেটেছে । কিন্তু একই জীবিকায় সকলের থাকা সম্ভব হয় নি । কেউ অধ্যাপক তো কেউ স্কুলের শিক্ষক । কিন্তু প্রত্যেকেই শিক্ষা জগতের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে । প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহান্তে এই পাঁচ বন্ধু একসাথে মিলিত হবেই । চলবে গল্পগুজব এবং সুখ দুঃখের কথা । কর্মব্যস্ত জীবনেও প্রত্যেক বন্ধুর সাহিত্য প্রীতি অমলিন রয়েছে । বরং বলা ভালো , আরো সমৃদ্ধ এবং সম্পৃক্ত হয়েছে । সপ্তাহান্তে শনিবার এই পাঁচ বন্ধু কলেজস্ট্রিটের কফি হাউসে এসে উপস্থিত হয় । শহর কলকাতার হৃদয় হলো কলেজস্ট্রিট । তাই কারোরই বাড়ি ফিরবার তাড়া নেই । গাড়িঘোরা অনেক রাত অবধি পাওয়া যায় । আড্ডা চলে রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত । এইঅঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ এই পাঁচ বন্ধু । কফিহাউসের কর্মীরাই ভালোবেসে ওদের নাম দিয়েছে "পঞ্চবান" ।
আজ পঁচিশে বৈশাখ , রবিঠাকুরের জন্মদিন । পাঁচ বন্ধুই এই দিনটাতে অফিস ছুটি নেয় । বিকেল বিকেল , আকাশ , এবং ক্ষিতি কফি হাউসের নির্ধারিত টেবিলে এসে উপস্থিত হলো । ঠিক হয়েছে "রবি বন্দনায়" আজ পাঁচ বন্ধু আজকের দিনটাকে রবি ঠাকুর কে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবে । হবে পরস্পরের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা । গান , কবিতা , গল্প - সমস্ত সৃষ্টিকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে সাজানো হবে এই কফি হাউসে । ওদের অজান্তেই আরও অনেক রবীন্দ্র প্রেমী এসে উপস্থিত হয় । হয়ে ওঠে সফল উদযাপন "রবী আরাধনা"। কিন্তু আজ কেন , সমীর , ভাস্কর এবং সলিল আসতে দেরী করছে ?
আধঘন্টার মধ্যেই "কফিহাউসের" পঞ্চবান এসে উপস্থিত হলো । কফি হাউসের কর্মীবৃন্দও খুব খুশি হলো ওদের দেখে । কফিহাউসের আভিজাত্য কে ধরে রাখার দায়িত্ব তো ওদেরই হাতে । আকাশ মনের আনন্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "পঁচিশে বৈশাখ" কবিতার আবৃত্তি দিয়ে বিশ্বকবি কে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে শুরু করলো -
" হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ ।
দিগন্তে আরক্ত রবি :
অরণ্যের ম্লান ছায়া ,
বাজে যেন বিষণ্ণ ভৈরবী ।
শাল - তাল - শিরিষের মিলিত মর্মরে
বনান্তের ধ্যান ভঙ্গ করে ।
রক্ত পথ শুস্ক মাঠে ,
যেন তিলকের রেখা সন্ন্যাসীর উদার ললাটে ।......."
সমীর , আকাশ কে থামিয়ে দিল । সকলের উদ্দেশ্যে সমীর বললো , আজ আমাদের আলোচনার উপজীব্য হবে "রবীন্দ্রনাথ এবং প্রকৃতি ।" কফিহাউসের একজন পরিচিত বয়স্ক কর্মচারী বলে উঠলেন , "একদম ঠিক আলোচনার বিষয় বেছেছো , বাবারা । কারণ - ক্ষিতি , অপ , ত্যেজ , মরুৎ ও ব্যোম - এই পাঁচটি নিয়েই তো প্রকৃতি । আর তোমাদের নামের মধ্যেই তো প্রকৃতি নিহিত রয়েছে ।"
পাঁচ বন্ধু সমস্বরে ওই বয়স্ক কর্মচারী কে শ্রদ্ধা মিশ্রিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বললো , " একদম ঠিক বলেছেন রমেশ কাকা । " ক্ষিতি বলে উঠলো , একদম ঠিক বলেছেন রমেশ কাকা । কারণ , ক্ষিতি হলো মাটি , অপ হলো সলিল , ত্যেজ হলো ভাস্কর , মরুৎ হচ্ছে সমীর এবং ব্যোম হলো আকাশ । আমি নিজে কখনো এভাবে চিন্তাই করিনি । রমেশ কাকা , আপনার কাছে এই শিক্ষার জন্য ঋণী থাকলাম । আমরা একত্রিত হলেই প্রকৃতি আমাদের সামনে প্রতীয়মান হবে ।
ক্ষিতি কে সম্পূর্ণ সমর্থন করে আকাশ নিজের কবিতা থামিয়ে বললো , দেখ ভাই , বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রকৃতি সমার্থক । কফিহাউস থেকে আমাদের নাম করণ করা হয়েছে "পঞ্চবান" । এই কথাটারও প্রকৃতি কেন্দ্রিক একটা সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে ।
আকাশ বলতে শুরু করলো , "পৌরাণিক হিন্দু শাস্ত্র মতে , কামদেব বা মদন দেবের পাঁচটি বান বা পঞ্চশর হলো , সম্মোহণ , উন্মাদন , শোষণ , তাপন ও স্তম্ভন । এই পাঁচটি বান ফুলের তৈরী বলে এদের "পুষ্পশর"ও বলা হয় । তাই পঞ্চবানে ব্যবহৃত পাঁচটি ফুল হলো , অরবিন্দ অর্থাৎ পদ্ম , আম্র , অশোক , নবমল্লিকা ও রক্তৎপল অর্থাৎ লাল পদ্ম" । সেইজন্য ফুল তো প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ । অর্থাৎ যে দিক দিয়েই বিচার করা হোক , রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে , প্রকৃতির আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর অন্যকোনো উপায় নেই ।
আকাশ বলতে থাকলো , " রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুরাগী এবং সমালোচক প্ৰখ্যাত বিজ্ঞানী ও রাশি বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের দৃষ্টিতে আমরা জানতে পারি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ছিল একাধারে সৌন্দর্য , বিজ্ঞান ও জীবন চেতনার আধার । তাঁর রচনা ও স্মৃতিচারণ থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ভাবনার যে তাৎপর্য উঠে আসে , তা নিয়ে কিছু আলোচনা করছি -
১) সৌন্দর্য ও সাহিত্যের মিলন ক্ষেত্র : প্রশান্তচন্দ্র এবং তাঁর স্ত্রী নির্মলকুমারী মহলানবিশের সাথে রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ সম্পর্ক ছিল । তাঁদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় , রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে কেবল দেখার বস্তু হিসেবে নয় , জীবনের পরম আশ্রয়ে পরিণত করেছিলেন । প্রকৃতি কবির কাব্যে ও গানে এক গভীর জীবন্ত সত্ত্বা হয়ে ধরা দিত ।
২) প্রকৃতি পাঠ ও বিজ্ঞান : প্রশান্ত চন্দ্র নিজে পদার্থ বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন । তাঁর আলিপুর আবহাওয়া অফিসে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই তাঁর অতিথি হতেন । প্রশান্তচন্দ্রের মতে , রবীন্দ্রনাথের মধ্যে প্রকৃতিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এবং নিখুঁত পর্যবেক্ষণের মধ্যমে জানার এক অদম্য কৌতুহল ছিল ।
৩) মানব কল্যাণে প্রকৃতির ব্যবহার : কেবল নন্দনিকতার চর্চা নয় , শ্রীনিকেতনে কৃষি ও পক্ষী উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রকৃতি ও আবহাওয়ার ভূমিকা রবীন্দ্রনাথের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল । প্রশান্তচন্দ্রের সক্রিয় উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে ও শ্রীনিকেতনে আবহাওয়া সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল , যা কবির প্রকৃতি নির্ভর গ্রামন্নয়ন দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ ।
৪) শান্তিনিকেতনের শিক্ষায় প্রকৃতি : প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ বিশ্বভারতীর আদর্শ ও শিক্ষাচিন্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন । তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয় যে , রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষা কখনোই কৃত্রিম চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় । গাছপালা , ঋতুচক্র ও উন্মুক্ত প্রকৃতির সাহচর্যে শিশুদের বিকাশই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি দর্শনের প্রধান তাৎপর্য ।
সমীর আকাশকে থামিয়ে দিয়ে বললো , " আমিও রবীন্দ্রনাথ এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনের উপর কিছু বলতে চাই । ভাই , কিছু মনে করিস না , আকাশ । কারণ , এখনই না বলতে পারলে আমি ভুলে যেতে পারি । তখন আফসোস থেকে যাবে ।
সমীর বলতে আরম্ভ করলো । রবীন্দ্র - সাহিত্য ও দর্শনে শঙ্খ ঘোষের অনুধাবন অত্যন্ত সুগভীর এবং মনণশীল । তাঁর বিশ্লেষনে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি কেবল বাইরের কোনো রূপ বা দৃশ্য নয় , বরং তা মানবসত্ত্বা , জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ । শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ এবং প্রকৃতির সম্পর্কের কয়েকটি প্রধান দিক আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছি -
১) জীবন ও জগতের অভিন্ন স্রোত : শঙ্খ ঘোষ উপলব্ধি করেছেন , রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ভাবনায় কোনো বিচ্ছিন্নতা নেই । তাঁর "গীতাঞ্জলি" পর্যায়ের গান বা কবিতায় প্রকৃতি ও মানবাত্মা এক অখণ্ড জীবনস্রোতে বাঁধা । প্রকৃতি এবং মানুষের শিরা উপশিরায় এই আনন্দ ও প্রাণের স্পন্দন বহমান - এই সত্যটিকে শঙ্খ ঘোষ তাঁর আলোচনায় বারবার তুলে ধরেছেন ।
২) দুঃখ ও আনন্দের মেলবন্ধন : শঙ্খ ঘোষ তাঁর "এ আমির আবরণ" বা অন্যান্য রবীন্দ্র আলোচনায় দেখিয়েছেন যে , প্রিয়জনের বিয়োগের মতো চরম ব্যক্তিগত দুঃখের মুহূর্তেও কবিগুরু প্রকৃতির মাঝেই মুক্তির বা সান্ত্বনার দিশা খুঁজে পেয়েছেন । প্রকৃতি যেন কবির ব্যক্তিগত বেদনাকে বিশ্বজনীন আনন্দের মহিমায় রূপান্তরিত করে ।
৩) আমজাগরণের মাধ্যম : শঙ্খ ঘোষ রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ও দর্শন কে রোমান্টিকতা হিসেবে দেখেননি , বরং তাঁর গান ও সাহিত্যকে তিনি "বিরামহীন আত্মজাগরণের আত্মদীক্ষা" বলেছেন । তাঁর মতে , রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পাঠ মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এক বৃহত্তর বিশ্বমানবিক চেতনার দিকে ধাবিত করে ।
৪) আদি ও অকৃত্রিম আশ্রয় : শান্তিনিকেতনের মুক্ত প্রাঙ্গনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আজীবন যে আকর্ষণ ছিল , তা শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিতে এক অমোঘ আকর্ষণ । প্রকৃতির উন্মুক্ত আলো - বাতাস ও মুক্ত চিন্তাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা এবং শিল্পচিন্তার মূল ভিত্তি ছিল ।
শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধ ও সমালোচনা এবং সাহিত্য পাঠ করলে বোঝা যায় , তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিকে কোনো স্থির চিত্র হিসেবে দেখেননি , বরং তাকে জীবনের নিত্য - সংকট ও উত্তরণের পথ হিসেবে বিবেচনা করেছেন ।
ক্ষিতি সমীর কে বললো , আরে দাঁড়া ভাই , আমাকেও একটু বলবার সুযোগ দে । ক্ষিতি বলতে আরম্ভ করলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রকৃতিকে কখনোই পৃথক ভাবে ভাবাটাই অসম্ভব , কারণ , প্রকৃতি এবং রবীন্দ্রনাথ একে অপরের পরিপূরক ।
বিশিষ্ট ভাষা সংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক - আহমেদ রফিকের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি চেতনা কেবল রোমান্টিক বা রূপময় নয় : বরং তা জীবন ঘনিষ্ট , বিজ্ঞান মনস্ক এবং মানবতাবাদী । তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় দেখিয়েছেন যে , রবীন্দ্র সাহিত্য প্রকৃতি ও মানবাত্মা অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত । আহমেদ রফিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ এবং প্রকৃতির সম্পর্ককে কয়েকটি প্রধান দৃষ্টিকোণে ভাগ করা যায় -
১) নিঃসর্গ ও রোমান্টিকতা থেকে উত্তরণ : রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রকৃতি শুরু থেকেই কেবল সৌন্দর্যের আধার হিসেবে ছিল না । আহমেদ রফিকের মতে , কৈশোর এবং যৌবনের মুগ্ধতা পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন ও কল্যাণমুখী । এই প্রকৃতি মানুষের দুঃখ - বেদনা , আনন্দ ও দর্শনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ।
২) বিজ্ঞানমনস্ক প্রকৃতি : প্রকৃতির প্রতি কবির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক । আহমেদ রফিক তাঁর রবীন্দ্র - বিশ্লেষনে তুলে ধরেছেন যে , ঋতুচক্র , গাছপালা , নদীনালা এবং বিশ্বচরাচরের প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর কৌতূহল ছিল । প্রকৃতির নিয়ম ও বিশ্বপ্রকৃতির কার্যকারণ কবিকে গভীরভাবে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছিল , যা তাঁর দৃষ্টিতে নান্দনিক রূপ লাভ করে ।
৩) জীবনবাদী এবং শান্তিনিকেতন দর্শন : শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত পরিবেশে প্রকৃতি ও আশ্রয়ের ধারণা রবীন্দ্রনাথের কর্মজীবনের এক বড় সাধনা ছিল । আহমেদ রফিকের দৃষ্টিতে প্রকৃতি এখানে হয়ে উঠেছিল শিক্ষার মাধ্যম এবং মানুষের পরম বন্ধু । রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষরোপন উৎসব ও হালকর্ষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না , এর পিছনে ছিল প্রকৃতির সাথে সুদৃঢ় মেলবন্ধন তৈরীর এক গভীর জীবনবোধ ।
৪) গ্রামীণ ও লোকায়ত প্রকৃতি : রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি মানেই শুধু অট্টালিকার বাইরের আকাশ বা বনভূমি নয় । তাঁর প্রকৃতিতে আছে বাংলার মাটি , নদী ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন । রবীন্দ্র সাহিত্যে নিসর্গের এই বাস্তববাদী ও গ্রামীণ রূপটি আহমেদ রফিকের রচনায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে ।
আজকে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে রবীন্দ্র আলোচনা একদম জমে উঠেছে । কফি হাউসে উপস্থিত বহু রবীন্দ্র অনুরাগী , পাঁচ বন্ধুর টেবিলকে ঘিরে ধরেছে । প্রত্যেকেই এই আলোচনা কে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওযার জন্য উৎসাহিত করতে লাগলো । কিন্তু হঠাৎই কফি হাউসের সম্ভবত একজন আধিকারিক এসে কিছুটা কর্কশ ভঙ্গিতেই আকাশদের উদ্দেশ্য করে বললো , "আপনারা অনেক্ষন ধরে জায়গা আটকে রেখেছেন । আমার অন্যান্য "কাস্টমারদের" অসুবিধা হচ্ছে"। উপস্থিত কফি হাউসের শ্রোতারা সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠলো , তারা বলতে লাগলো , এই আধিকারিক ঠিক কথা বলছেন না । আমাদের মধ্যে কেউই কোনোরকম অভিযোগ করেননি ।
হৈ - হট্টগোলের মধ্যে অভিযোগকারী কফি হাউসের আধিকারিক , আরও জনা পাঁচেক বয়স্ক মানুষদের নিয়ে এসে বললো , " ওনারাই আমাকে অভিযোগ করেছেন"।
আকাশ , সমীর , ভাস্কর , সলিল এবং ক্ষিতি অবাক হয়ে শুধু বললো , আজ পঁচিশে বৈশাখ , আপনাদের মতো গুরুজন স্থানীয় ব্যক্তিরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনের উদযাপনে যখন আপত্তি তুলছেন , এর থেকে বেদনার আর কিছু হতে পারে না !
ভাস্কর সকলকে উদ্দেশ্য করে বললো , " ঠিক আছে আমরা আলোচনা শেষ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা আবৃত্তি করে । আপনারা সকলে যাঁরা রবীন্দ্র অনুরাগী , তাঁরা আমার সঙ্গে গলা মেলাতে পারেন । ভাস্করের অসাধারণ আবৃত্তি করার ক্ষমতা । উদাত্ত গলায় ভাস্কর শুরু করলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সবুজের অভিযান"কবিতা -
ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ।
আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চ তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।
খাঁচা খানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ,
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীণ , ওই যে পরম পাকা ,
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
শিখায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে যে বান ডেকেছে
জোয়ার - জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায় ,
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে এ কী বিষম কান্ডখানা ।
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাচায় ।
আয় প্রচন্ড , আয় রে আমার কাঁচা ।
শিকল - দেবীর , ওই যে পূজাবেদী
চিরকাল কী রইবে খাড়া ।
পাগলামি তুই আয়রে দুয়ার ভেদী ।
ঝড়ের মাতন , বিজয় - কেতন নেড়ে
আজকের কিছু বয়স্ক মানুষের বাধায় এবং অনাকাঙ্খিত সমাপ্তির দুঃখে , সলিল মুখ চাপা দিয়ে কাঁদছিলো । আশাহতের কারণে উপস্থিত সকল রবীন্দ্র অনুরাগীরা সলিল কে সান্ত্বনা দিতে লাগলো । কেউ কেউ এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদী ঐসব বয়স্ক মানুষদের কিছু বলতে এগিয়ে গিয়ে দেখলো , ভাস্করের উদাত্ত গলায় "রবীন্দ্র - প্রতিবাদী" কবিতা "সবুজের অভিযান" শুনেই লজ্জায় , কফি হাউস ছেড়ে চলে গেছে ঐসকল বয়স্ক মানুষেরা । একেই বলে সংঘর্ষ বিহীন প্রতিবাদ ।
