গল্প - শেষ বিকেলের সেই চিঠি
বর্ষার শেষ বিকেল। আকাশ জুড়ে মেঘের আনাগোনা। দূরে তালগাছের মাথা দুলছে, মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্নিগ্ধ বাতাস। গ্রামের এক কোণে শতবর্ষী বটগাছের নিচে বসে ছিল তিতলি। হাতে তার একটি পুরোনো বই— Rabindranath Tagore-এর কবিতার সংকলন।
পরদিন ছিল জেলা-স্তরের সাহিত্য প্রতিযোগিতা। বিষয়— “রবীন্দ্রনাথ ও প্রকৃতি”।
অনেকেই লিখবে প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে, কবিগুরুর কবিতা নিয়ে, তাঁর গান নিয়ে। কিন্তু তিতলি চেয়েছিল এমন কিছু লিখতে, যা শুধু বিচারকদের নয়, মানুষের হৃদয়ও ছুঁয়ে যাবে। অথচ কলম হাতে নিয়েও সে একটি লাইন লিখতে পারছিল না।
মনটা ভারী হয়ে উঠল। কয়েক মাস আগেই সে তার দাদুকে হারিয়েছে। দাদুই তাকে প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় উঠোনে বসে দাদু বলতেন, “প্রকৃতিকে শুধু চোখে দেখিস না দিদিভাই, মন দিয়েও দেখ। তাহলেই রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারবি।”
সেই কথা মনে পড়তেই তিতলি ধীরে ধীরে গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে লাগল।
ধানক্ষেতের ওপর সোনালি আলো পড়েছে। কোথাও সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও শালিকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। দূরে নদীর জলে আকাশের রঙ মিশে এক অপূর্ব ছবি এঁকেছে।
হঠাৎ তিতলির মনে হল, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে কথা বলছে।
সে চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের সেই গান—
"আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে,
জানিনে, জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।"
কী আশ্চর্য! শত বছর আগে লেখা সেই পংক্তিও যেন আজকের এই বিকেলের অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়।
তিতলি ভাবল, রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রকৃতি ছিল না শুধু ফুল, পাখি, নদী কিংবা আকাশ। প্রকৃতি ছিল তাঁর প্রাণের সঙ্গী। মানুষের সুখে যেমন তিনি আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন, তেমনি প্রকৃতির প্রতিটি রূপেও খুঁজে পেয়েছেন জীবনের অর্থ।
শান্তিনিকেতনের খোলা আকাশের নিচে তিনি শিশুদের পড়তে শিখিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে প্রকৃত শিক্ষা পাওয়া যায় না। প্রকৃতির কাছেই মানুষ সবচেয়ে বড় শিক্ষা পায়।
বাতাস তখন একটু জোরে বইতে শুরু করেছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তিতলির মনে হল, গাছগুলো যেন তাকে ঘিরে গল্প বলছে।
একটি শুকনো পাতা তার সামনে এসে পড়ল।
সে পাতাটি হাতে তুলে নিয়ে ভাবল— আজ মানুষ কত ব্যস্ত! উন্নয়নের নামে গাছ কাটছে, নদী দূষিত করছে, পাখিদের বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছে। অথচ বহু আগেই রবীন্দ্রনাথ সতর্ক করেছিলেন মানুষকে।
তাঁর কণ্ঠে যেন ভেসে আসে—
"দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।"
এ শুধু একটি কবিতার পংক্তি নয়, এ যেন প্রকৃতির আর্তনাদ।
তিতলির চোখ ভিজে উঠল।
সে হঠাৎ অনুভব করল, প্রকৃতি কাঁদলে মানুষও কাঁদে। নদী মরে গেলে সভ্যতা মরে যায়। গাছ হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় জীবনের শ্বাস।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে শেষ আলোটুকু নিভে যাচ্ছে। পাখিরা ফিরে যাচ্ছে তাদের নীড়ে।
তিতলির মনে হল, দাদু যেন ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।
মৃদু কণ্ঠে বলছেন, “দেখলি তো? প্রকৃতিকে বুঝতে পারলেই রবীন্দ্রনাথকে বোঝা যায়।”
সেই রাতে তিতলি আর কোনো বই খুলল না।
জানলার পাশে বসে চাঁদের আলো, বাতাসের শব্দ, রাতজাগা পাখির ডাক আর নিজের হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে লিখতে শুরু করল তার রচনা।
সে লিখল—
“রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে শুধু ভালোবাসেননি, তিনি প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর কবিতায় নদী কথা বলে, আকাশ স্বপ্ন দেখায়, ফুল হাসে, বাতাস গান গায়। তাই রবীন্দ্রনাথকে পড়া মানে প্রকৃতিকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আর প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে পৃথিবীকে, মানুষকে এবং জীবনকে ভালোবাসা।”
কয়েকদিন পরে প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশিত হল।
তিতলি প্রথম হয়েছে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেওয়ার সময় তার চোখ চলে গেল জানলার বাইরে। সেখানে একটি শিউলি গাছ বাতাসে দুলছে।
তার মনে হল, এই পুরস্কার শুধু তার নয়। এটি সেই সবুজ মাঠের, সেই নদীর, সেই বর্ষার মেঘের, সেই হারিয়ে যাওয়া দাদুর, আর সেই মহান কবির— যিনি আমাদের শিখিয়েছেন প্রকৃতির প্রতিটি কণার মধ্যে ঈশ্বরের স্পর্শ অনুভব করতে।
আজও ভোরের শিশিরে, কোকিলের ডাকে, নদীর কলকল ধ্বনিতে, কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে এবং মানুষের মমতাময় হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন।
কারণ প্রকৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথও থাকবেন— বাংলার আকাশে, বাংলার বাতাসে, আর কোটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে।
