Logo
logo

সাহিত্য / কবিতা

প্রবন্ধ--প্রকৃতির অনন্ত সুরে রবীন্দ্রনাথ

প্রকৃতির অনন্ত সুরে রবীন্দ্রনাথ: হৃদয়ের জানালায় এক চিরসবুজ আলোকধারা

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর”—
এই একটি পঙ্‌ক্তির মধ্যেই যেন ধ্বনিত হয়েছে এক কবিহৃদয়ের গভীর আকুতি। যে হৃদয় প্রকৃতিকে শুধু চোখে দেখেনি, অনুভব করেছে আত্মার গভীরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে প্রকৃতি ছিল না নিছক গাছপালা, নদী, আকাশ কিংবা ঋতুচক্রের পরিবর্তন; প্রকৃতি ছিল তাঁর অন্তরের সবচেয়ে আপন সঙ্গী, নিঃসঙ্গতার সান্ত্বনা, সৃষ্টির প্রেরণা এবং ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার এক অনন্য পথ।

ভোরের প্রথম আলো, শিশিরভেজা ঘাস, কাশফুলে ভরা শরতের প্রান্তর, বর্ষার ঝরঝর বৃষ্টি, বসন্তের পলাশ-শিমুল কিংবা নদীর অবিরাম স্রোত— সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের গভীরতম সত্য। তাই তো তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে—

“আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান।”

এই উপলব্ধি কেবল একজন কবির নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির আত্মিক বন্ধনের এক অনবদ্য ঘোষণা।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পড়লে মনে হয়, প্রকৃতি যেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মানুষের কাছে যা শুধুই ঋতু পরিবর্তন, তাঁর কাছে তা ছিল অনুভূতির ভাষা। বর্ষার মেঘে তিনি শুনেছেন বিরহের সুর, শরতের আকাশে খুঁজে পেয়েছেন প্রশান্তি, আর বসন্তের ফুলে দেখেছেন নবজন্মের আনন্দ।

তাই তিনি লিখেছেন—

“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে,
জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।”

এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তি পড়লেই যেন জানালার ওপারে বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়। মনে হয়, প্রকৃতি আর মানুষের মন এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনে বাঁধা।

আবার মেঘ সরে যখন সূর্যের আলো পৃথিবীকে ছুঁয়ে যায়, তখন তাঁর গান হয়ে ওঠে আনন্দের উচ্ছ্বাস—

“মেঘের কোলে রোদ হেসেছে,
বাদল গেছে টুটি।”

প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের সৌন্দর্য। তাঁর চোখে প্রকৃতি ছিল এক জীবন্ত সত্তা, যে হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, কথা বলে।

শিলাইদহের পদ্মার তীরে বসে তিনি দেখেছেন নদীর অনন্ত রূপ। শান্তিনিকেতনের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিরঙা সৌন্দর্য, পলাশের রাঙা আগুন আর তালগাছের নীরব দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর মনকে ভরিয়ে দিয়েছিল অপার্থিব শান্তিতে। তাই তো তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষা হোক প্রকৃতির কোলে, মুক্ত আকাশের নিচে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতিই মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

গ্রামের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ধরা পড়েছে এই পঙ্‌ক্তিতে—

“গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ
আমার মন ভোলায় রে।”

এ শুধু গ্রামের পথের কথা নয়; এটি মানুষের শিকড়ের প্রতি টান, মাটির প্রতি প্রেম এবং প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন, সৌন্দর্য দূরে নয়, আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। তাই তিনি লিখেছিলেন—

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।”

কত গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে! মানুষ দূরের মোহে ছুটে চলে, অথচ কাছের সৌন্দর্যকে দেখতে ভুলে যায়।

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। বনভূমি উজাড় হচ্ছে, নদী দূষিত হচ্ছে, পাখিদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের নগরে। এই সংকটের সময়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি যেন আজও দূর থেকে বলে চলেছেন— প্রকৃতিকে ভালোবাসো, কারণ প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ।

প্রকৃতি তাঁকে শিখিয়েছিল ধৈর্য, বিনয়, সহনশীলতা এবং ভালোবাসা। সেই শিক্ষাই তিনি তাঁর সাহিত্যজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর গান, কবিতা ও প্রবন্ধে প্রকৃতি শুধু রূপসী নয়, সে জীবনের পথপ্রদর্শক।

তাই রবীন্দ্রনাথকে শুধু বিশ্বকবি বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি প্রকৃতির এক চিরন্তন উপাসক, যাঁর কলমে নদী কথা বলে, আকাশ গান গায়, ফুল ভালোবাসার ভাষা শেখায়, আর বাতাস বয়ে আনে মানবতার বার্তা।

যতদিন ভোরের আলো ফুটবে, বর্ষার বৃষ্টি ঝরবে, শরতের কাশফুল দুলবে, বসন্তের পলাশ রাঙাবে বনভূমি— ততদিন রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম বাংলা সাহিত্যকে আলোকিত করে যাবে।

তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন— মানুষ ও প্রকৃতি আলাদা নয়; তারা একই সুরের দুইটি ধ্বনি, একই হৃদয়ের দুইটি স্পন্দন। আর সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও প্রকৃতির বুকে, বাংলার মাটিতে এবং প্রতিটি সংবেদনশীল হৃদয়ে চিরজাগরূক, চিরসবুজ।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com