Logo
logo

গল্প / কাহিনী

গল্প -অতল বর্ষার নীল চিঠি


সেদিনও এমনই বৃষ্টি পড়ছিল। আকাশ যেন নিজের সমস্ত না-পাওয়া কষ্টগুলোকে মাটির বুকে ঝরিয়ে দিচ্ছিল অবিরাম। সন্ধ্যা নামার আগেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেঘলা চুপচাপ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের ভেতরেও যেন জমে ছিল অনেক দিনের না বলা কথা।
মেঘলা পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। ছোট্ট শহরের এক সাধারণ মেয়ে। বাবা-মাকে হারিয়েছে বহু আগেই। এখন একা থাকে নিজের ছোট্ট বাড়িটিতে। বাইরে থেকে তাকে দেখে কেউ বুঝতে পারত না, তার হৃদয়ের গভীরে কতটা শূন্যতা জমে আছে।
বছর সাতেক আগে অয়নের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। অয়ন ছিল এক সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। দুজনের সম্পর্কটা খুব সাধারণভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সাধারণ বন্ধুত্ব এক গভীর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিল।
অয়নের সবচেয়ে প্রিয় ছিল বৃষ্টি। সে বলত,
— "জানো মেঘলা, বৃষ্টি কখনও কাউকে ঠকায় না। মানুষ ভুলে যায়, বদলে যায়, কিন্তু বৃষ্টি ঠিক ফিরে আসে।"
মেঘলা হাসত।
— "তুমি একেবারে কবিদের মতো কথা বলো।"
— "ভালোবাসলে মানুষ কবি হয়।"
সেই কথাগুলো আজও কানে বাজে।
কিন্তু ভালোবাসার পথ সবসময় সরল হয় না।
অয়নের বাড়ির লোকেরা মেঘলাকে মেনে নিতে পারেনি। কারণ মেঘলা ছিল সাধারণ পরিবারের মেয়ে। অয়নের বাবা-মা চেয়েছিলেন, ছেলে বড় ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করুক।
অয়ন অনেক লড়াই করেছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় উচ্চশিক্ষার জন্য।
যাওয়ার আগে শেষবার দেখা হয়েছিল সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অয়ন বলেছিল,
— "আমার জন্য অপেক্ষা করবে?"
মেঘলা চোখের জল লুকিয়ে বলেছিল,
— "জন্মজন্মান্তর।"
অয়ন হেসে বলেছিল,
— "তাহলে আমিও ফিরে আসব।"
কিন্তু তারপর সবকিছু বদলে গেল।
প্রথম প্রথম নিয়মিত ফোন আসত। চিঠি আসত। ভিডিও কল হত। তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে গেল।
একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল।
মেঘলা অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অয়নের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পাড়ার সবাই বলত,
— "ছেলেটা নিশ্চয়ই অন্য কাউকে বিয়ে করেছে।"
কেউ কেউ হাসত।
— "এত বছর ধরে কেউ অপেক্ষা করে নাকি?"
কিন্তু মেঘলা অপেক্ষা করত।
বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে এখনও মনে মনে অয়নের সঙ্গে কথা বলত।
এভাবেই কেটে গেল সাত বছর।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রবল বর্ষণ শুরু হল। রাস্তার ধারে একটি পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিল মেঘলা।
হঠাৎ একটি ছোট্ট মেয়ে এসে তার হাত ধরল।
— "আপনি কি মেঘলা দিদি?"
মেঘলা অবাক।
— "হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কে?"
মেয়েটি বলল,
— "আমার নাম রূপা। বাবা আপনাকে একটা জিনিস দিতে বলেছেন।"
সে একটি পুরনো ডায়েরি হাতে তুলে দিল।
— "বাবা এখন হাসপাতালে আছেন। উনি বলেছেন, এটা আপনার কাছে পৌঁছে দিতে।"
মেঘলা বিস্মিত হয়ে ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
"মেঘলা, যদি কোনোদিন এই ডায়েরি তোমার হাতে পৌঁছায়, বুঝবে আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।"
হাত কাঁপতে লাগল তার।
নামটা দেখে বুকটা ধক করে উঠল।
অয়ন!
পাতাগুলো উল্টে সে জানতে পারল, বিদেশে যাওয়ার পর অয়ন এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। দীর্ঘদিন কোমায় ছিল। স্মৃতিশক্তির অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। সুস্থ হতে বছর কেটে যায়।
দেশে ফিরে এসে সে মেঘলাকে খুঁজেছিল। কিন্তু পুরনো ঠিকানায় আর কাউকে পায়নি। তারপর নিজেকে সমাজসেবায় নিয়োজিত করেছিল।
দুই বছর আগে এক অনাথ আশ্রম থেকে রূপাকে দত্তক নিয়েছিল।
শেষ পাতায় লেখা ছিল—
"তুমি যদি এখনও আমাকে মনে রাখো, তাহলে একবার দেখা করতে এসো। আমার জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু তোমাকে হারাতে চাইনি কখনও।"
ঠিকানাটা ছিল শহরের সরকারি হাসপাতালের।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সে দেরি না করে হাসপাতালে পৌঁছে গেল।
হাসপাতালের কেবিনে ঢুকতেই দেখতে পেল, জানালার পাশে বসে আছে অয়ন।
চুলে পাক ধরেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু চোখ দুটো ঠিক আগের মতোই।
মেঘলাকে দেখে অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— "তুমি এসেছ?"
মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— "এতদিন কোথায় ছিলে?"
অয়নের চোখ ভিজে উঠল।
— "নিজেকেই খুঁজছিলাম।"
দুজনেই অনেকক্ষণ কথা বলতে পারল না।
শুধু বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
রূপা এসে মেঘলার হাত ধরে বলল,
— "বাবা আপনার কথা অনেক বলেন। আপনি কি আমাদের সঙ্গে থাকবেন?"
মেঘলা তাকিয়ে রইল অয়নের দিকে।
অয়ন নিচু গলায় বলল,
— "এবার আর কোথাও যাব না।"
বাইরে বজ্রপাতের আলোয় আকাশ ঝলসে উঠল।
মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— "জানো, তুমি ঠিকই বলেছিলে। মানুষ বদলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু বৃষ্টি ফিরে আসে।"
অয়ন হাসল।
— "আর সত্যিকারের ভালোবাসাও।"
জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা নেমে আসছিল।
সেই ফোঁটার মধ্যে যেন সাত বছরের অপেক্ষা, অভিমান, কান্না আর ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন রাতের বৃষ্টি আর শুধু প্রকৃতির বৃষ্টি ছিল না।
সেটা ছিল দুটি হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ের পুনর্মিলনের নীরব সুর।
আর মেঘলা মনে মনে বুঝেছিল—
প্রেম কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও কখনও সে শুধু বর্ষার মেঘ হয়ে দূরে সরে থাকে। তারপর একদিন, ঠিক সময় হলে, নীল চিঠির মতো ফিরে আসে মানুষের জীবনে।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com