প্রবন্ধ-রবির নিমিত্তে
সদ্য প্রেমভঙ্গের পর হৃদয়ে যে নিঃশব্দ বিপর্যয় উপস্থিত হয়, তাহা বাহিরের লোকের চক্ষে তত সহজে ধরা পড়ে না। অন্তরে অন্তরে এক অদৃশ্য ঝড় প্রবাহিত হইতে থাকে; কিন্তু সমাজ তাহার শব্দ ঘুণাক্ষরেও শুনিতে পায় না। কালবৈশাখীর আকস্মিক অভিঘাতে যেরূপে শখের বাগানের পুষ্পরাজি মুহূর্ত্তে ভূপতিত হয়, সেইরূপ একদিন আমাদিগের সযত্নে সঞ্চিত স্বপ্নসমূহও ছিন্নভিন্ন হইয়া চারিদিকে উড়িয়া গেল।
রবীন্দ্র-রচনাবলীর পত্রসমূহ বাতাসে যেরূপে এদিক ওদিক ছুটিয়া যাইতেছিল, ঠিক সেই সময় “হতে পারিত” শব্দযুগল যেন আকস্মাৎ হৃদয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রদীপের ন্যায় জ্বলিয়া উঠিল। কত শত প্রশ্ন, কত অর্ধসমাপ্ত উত্তর, কত না-বলা অভিমান স্মৃতির পৃষ্ঠায় গড়াগড়ি খাইতে লাগিল। মনে হইল, আমার সেই দরাজ মনের দক্ষিণ জানালার সম্মুখে কে যেন দাঁড়াইয়া কহিতেছে, “আকাশ দেখিবার জন্য তোকে কেহ কখনও ভালোবাসে নাই।”
হইতেও তো পারিত, এই অনন্ত আকাশের প্রতি আমার নিবিড় প্রেম দেখিয়াই কেহ আমায় ভালোবাসিত। সকলের হৃদয় কি আর একরূপ? কেহ কেহ তো মানুষের দৃষ্টির ভিতর দিয়াই তাহার স্বপ্ন চিনিয়া লয়।
পাহাড়ের প্রতি আমার যে অনুরাগ চিরদিনের। বহিরঙ্গে যাহা কঠোর, অন্তরে তাহারও তো গলিত লাভার ন্যায় দহন রহিয়াছে। তথাপি পাহাড় নিজের অগ্নিকে আড়াল করিয়া নদীর জল শীতল রাখে। আমিও জীবনের নানাবিধ জ্বালা বুকের মধ্যে গোপন রাখিয়া মুখে প্রশান্তির আভাস লইয়া চলিবার চেষ্টা করি। হইতে পারিত, আমার এই নীরব সহিষ্ণুতার কারণেই কেহ আমায় ভালোবাসিত। বাহিরের দৃঢ়তার অন্তরালে যে ক্লান্ত কোমলতা লুকাইয়া থাকে, তাহা সকলের চক্ষে ধরা কেন যে পড়ে না? মানুষ বড় নিষ্ঠুর।
নিয়ম মানিয়া চলিবার প্রবৃত্তি আমার অতি অল্প। শব্দের সহিত খেলিতে খেলিতে কখন গদ্য কবিতায় পরিণত হয়, কখন ছন্দ ভাঙিয়া গান জন্মে, তাহার হিসাব আমি নিজেও রাখি না। ব্যাকরণের শাসন অনেক সময় হৃদয়ের আবেগকে শৃঙ্খলিত করিতে চাহে; কিন্তু হৃদয় সর্ব্বদা শৃঙ্খল মানে না যে। আমি নিয়ম ভাঙিয়াছি বলিয়াই হয়তো একদিন কেহ বাঁধভাঙা স্নেহে আমায় ভালোবাসিতে পারিত। যাহারা অত্যধিক শৃঙ্খলার ভিতরে বাস করে, তাহারা কখনও কখনও উচ্ছ্বাসের মূল্য বুঝিতে পারে না।
স্রোতের অনুকূলে যাওয়া আমার স্বভাববিরুদ্ধ। সমাজ যেদিকে অগ্রসর হয়, আমার পদক্ষেপ যেন অকারণে তাহার বিপরীত দিকে চলিতে চাহে। অনেকে ইহাকে জেদ বলে, অনেকে অবাধ্যতা। কিন্তু মানুষ কি কেবল সমাজের অনুগামী হইবার জন্যই জন্মগ্রহণ করে? যদি কখনও নিঃশর্ত স্নেহ লাভ করিতাম, তবে হয়তো এই ক্লান্ত পদযুগলও কাহারও সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে সম্মত হইত। হইতে পারিত, এমন একগুঁয়ে প্রাণের সহযাত্রী হইবার আকাঙ্ক্ষাতেই কেহ আমাকে ভালোবাসিত।
সমাজে কত রকমের মানুষ রহিয়াছে। কেহ কর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত, কেহ নৃত্যে পটীয়সী, কেহ সংসার গুছাইয়া রাখিবার আশ্চর্য দক্ষতা অর্জন করিয়াছে। কেহ সৌন্দর্যের প্রচলিত মানদণ্ডে পূর্ণ, কেহ বা সুন্দরতম কোটির অধিকারিণী, প্রশংসিত।
আর আমি? আমি অতি সাধারণ। না বিশেষ রূপ, না বিস্ময়কর প্রতিভা, না সমাজমুগ্ধ করিবার মত কোনও কৃতিত্ব। তথাপি মনে হয়, হইতে পারিত, এই সাধারণত্বের কারণেই কেহ আমায় ভালোবাসিত। কারণ সকলেই তো অসাধারণের পিছনে ধাবিত হয়; কিন্তু যে ব্যক্তি সাধারণের ভিতর লুক্কায়িত সৌন্দর্য দর্শন করিতে পারে, প্রকৃত প্রেমিক সম্ভবত সেইই।
পরিশেষে মনে হয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসার সহস্র শর্ত আরোপ না করিলেই বোধ হয় অনেক সম্পর্ক মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইত। আমরা পরস্পরকে গ্রহণ করিবার পূর্বে এত বিচার করি, এত তুলাদণ্ডে ওজন করি, যে হৃদয়ের সহজ স্নেহ ক্রমে ক্লান্ত হইয়া পড়ে। যদি শর্তসমূহ একে একে বিসর্জ্জিত হইত, তবে হয়তো আমার প্রেমও আজ বিলুপ্তির পথে যাইত না; হয়তো এখনও কোথাও নীরবে বাঁচিয়া থাকিত।
কিন্তু মানবজীবনের সর্ব্বাপেক্ষা বিস্ময়কর সত্য এই যে, যাহাকে আমরা অন্তিম অন্ধকার বলিয়া ভাবি, অনেক সময় তাহার অন্তরালেই ক্ষীণ আলোকরেখা লুক্কায়িত থাকে। সেই সময় আমার জীবনও এক গভীর অবসাদের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হইয়াছিল। চারিদিকে মানুষের কোলাহল থাকিলেও অন্তরে এমন এক নিঃসঙ্গতা জন্মিয়াছিল, যাহা ভাষায় ব্যক্ত করা দুঃসাধ্য। মনে হইত, সমস্ত পৃথিবী হইতে যেন আমি বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছি। জীবনধারণের প্রয়োজনীয় কারণসমূহ একে একে ম্লান হইয়া আসিতেছিল; নিশীথ রাত্রির ন্যায় এক অদৃশ্য অন্ধকার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল।
সেই দুর্বহ সময়েই রবীন্দ্রনাথ আমার নিকট কেবল কবি রূপে নহে, এক নীরব সহচর রূপে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার গানের পঙ্ক্তিমালা, তাঁহার কবিতার অন্তর্লীন ব্যথা, তাঁহার শব্দের গভীর মানবতা, আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের উপরে যেন স্নেহের করস্পর্শ রাখিল। যেদিন মনে হইয়াছিল, জীবন হইতে বিদায় লওয়াই বোধ হয় সর্ব্বাপেক্ষা সহজ পথ, সেইদিনই কোনও এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর জানালার বাতাস ভেদ করিয়া আমার অন্তরে প্রবেশ করিল। মনে হইল, পৃথিবীতে এখনও সৌন্দর্য আছে, এখনও বেদনার ভাষা আছে, এখনও মানুষের কান্নাকে কেহ শব্দে পরিণত করিয়া রাখিয়া গিয়াছে।
রবীন্দ্রনাথ যেন নীরবে শিক্ষা দিলেন, দুঃখ লজ্জার বিষয় নহে; ভাঙিয়া পড়াও মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। তিনি বুঝাইলেন, হৃদয়ের সমস্ত ক্ষত নিয়েও মানুষ পুনরায় সূর্যের দিকে মুখ তুলিতে পারে। “আলো আমার আলো” কিংবা “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে”, এই সকল পঙ্ক্তি কেবল গান ছিল না, সেই রাত্রিগুলিতে তাহাই আমার বাঁচিয়া থাকার কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। যে আমি একদিন সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত স্বপ্ন, এমনকি নিজের অস্তিত্বের প্রতিও ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, সেই আমাকেই রবীন্দ্রনাথ পুনরায় শব্দের ভিতর দিয়া জীবনের প্রতি ফিরাইয়া আনিলেন। অতএব আজ মনে হয়, মানুষ কখনও কখনও মানুষের দ্বারাই নয়, সাহিত্য, সুর ও কবিতার দ্বারাও রক্ষা পায়। আর আমি সেইদিন রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের হাত ধরিয়াই মৃত্যুচিন্তার অন্ধকার হইতে ধীরে ধীরে জীবনের দিকে ফিরিয়া আসিয়াছিলাম।
