Logo
logo

গল্প / কাহিনী

গল্প-যখন বৃষ্টি থামে



আজ রবিবার।
সকাল থেকেই একনাগাড়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রকৃতি দেবী তার কালের দ্বিতীয় রূপটি নিয়ে স্বমহিমায় হাজির।
বিছানা ছেড়ে উঠতে একদম ইচ্ছে করছিল না মেঘলার।
ঘড়িতে দশটা বাজে। তাকে আজ আবার বেরোতে হবে। একটা ইন্টারভিউ আছে --- স্বনামধন্য লেখক, ঈশান ঘোষ। শোনামাত্রই বুকের ভেতর একটা চেনা অনুভূতি জেগে উঠেছিল।
সম্পাদক মলয়বাবু এত কম সময়ের নোটিশে দায়িত্বটা দিয়েছেন যে, ঈশান ঘোষ সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার সময়টুকুও পায়নি সে।
নামটা তার বড্ড চেনা, মানুষটাও কি?
বৃষ্টিভেজা ছুটির দিনটার আজ দফারফা। কিন্তু মনে এক উত্তেজনা। একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে উঠে রেডি হতে লাগল।
দুপুর ১২ টা, সানশাইন ক্যাফে।
রিজার্ভ করা টেবিলে বসে মেঘলা অপেক্ষা করতে লাগল ঈশানের।
মেঘলা পেশায় একজন সাংবাদিক। কত লোকের ইন্টারভিউ সে নিয়েছে। কিন্তু আজ তার মনের মধ্যে অদ্ভুত এক খচখচানি হয়েই চলেছে। বারবার একটাই প্রশ্ন তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
"আপনি এসে গেছেন? সরি, আমার একটু দেরি হলো।"
--- ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই কি দেখছে মেঘলা?
২৫ বছর আগের কোন ছবি হঠাৎ আজ তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল?
" তুমি?" --- ঈশান ঢোক গিলে বলে উঠল।
"হ্যাঁ, আমিই।" মুহূর্তের মধ্যে মেঘলা নিজেকে সামলে বলে উঠল --- "ইন্টারভিউটা আমারই নেওয়ার কথা।"
মেঘলা একটু হাসার চেষ্টা করলেও, পারল না ঠিকমত, চোখদুটো সঙ্গ দিলো না।
দুজনের মাঝখানে আজ ২৫টা বছর অতিক্রান্ত....
আবার মুখোমুখি দুই প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকা। অঝোর ধারায় সারা দিনের বৃষ্টিতে শহর আজ জলমগ্ন।
সেদিনের বিচ্ছেদটা কেন ছিল?
একটি ভুল বোঝাবুঝি, এবং না বলা কিছু সত্যি যা কেউই সেদিন উচ্চারণ করতে পারেনি।
বাইরে কুয়াশা ঘেরা বৃষ্টি এবং ভেতরে ধোঁয়া ওঠা দুই কাপ গরম কফির সাথে শুধুই নীরবতা আজ দুজন মানুষকে ঘিরে।
আবারও এক বৃষ্টির দিন।
তারা জানে না, অতীতকে সামনে আনবে? নাকি, পুরনোকে ভুলে এগিয়ে আসবে নতুন করে?
সেদিনের পরিস্থিতির চরম শিকার হয়ে তাদের বিচ্ছেদটা ঘটলেও আজ তারা সময়ের প্রবাহে নিজেদের জীবনে অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
জীবন তাদের আজ অন্য দায়িত্বে বাঁধা।
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মেঘলা জিজ্ঞাসা করে,---
" আজ তুমি পেলে তোমার প্রশ্নের উত্তর? এতটা সময় নিলে?... পঁচিশ বছর?"
ঈশান ব্যথা মেশানো হাসি হেসে বলে,
" সময় বৃষ্টির মতই। হয়তো এক সময় থেমে যায়, কিন্তু মাটির গন্ধটা রয়ে যায়।"
" তুমিও সেদিন আমার ফোনটা ধরো নি।"
মেঘলা ক্লান্তি মেশানো গলায় বলে---" আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার অনুভূতিকে কোনদিন গুরুত্বই দাওনি। সেদিন যদি আমার লড়াইয়ে তোমাকে পাশে পেতাম, তাহলে সবকিছু অন্যরকম হতো।"
নতুন করে শুরু হোলো তাদের কথাবার্তা। এর ফাঁকেই মেঘলার ইন্টারভিউ ও শেষ হয়।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঈশান জানায়, মেঘলার দেওয়া প্রথম উপহারটি, সেই লাল গোলাপটা, শুকিয়ে গেলেও আজও সে তাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
আর মেঘলার ব্যাগে আজও রয়ে গেছে সেই দিনের পুরনো টিকিটটা, যে গন্তব্যতে আর কোনদিনও তারা দুজনা দেখা করেনি সেদিনের পর থেকে।
বৃষ্টির এক দুপুরকে সাক্ষী রেখে ২৫ বছরের জমে থাকা অনুভূতিগুলো সেদিন অনেক কথা, গল্প হয়ে ঝরে পড়ছিল।
একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। বাইরে দেখা গেল কালো মেঘ সরে গেছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝকঝকে আলো উঁকি মারছে। সেখানেও কি খুশির আলো উপচে পড়ছে?
মেঘলা মৃদু হেসে বলে ওঠে--" আকাশেরও কান্না এতক্ষণে থামল তাহলে।"
ঈশান উত্তর দেয় না। শুধু মনে মনে বলে --" হয়ত মন বইয়ের পাতায় নিঃশব্দে লেখা অভিযোগগুলোও আজ থেকে থেমে গেল।"
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে দুজনে পাশাপাশি হাঁটল কিছুক্ষণ।
এখন দুজনার মাঝে যে নীরবতা, তা অতটা ভারী নয়।
" আসি তাহলে, আবার দেখা হবে" --- ঈশান হাতটা বাড়িয়ে দেয় মেঘলার দিকে।
মেঘলা হালকা হেসে ঈশানের কাঁধে তার হাতটা রাখে।
ঝকঝকে আকাশে সহসা রোদ থাকতেই আবার বৃষ্টি নামে।
প্রকৃতির ও যেন এক অমীমাংসিত কান্নার অবসান ঘটিয়ে আনন্দে নতুন করে আবার চোখ জলে টইটম্বুর।
সেদিন শেষ বেলাতে কোন প্রতিশ্রুতি নয়, কোন ঘোষণা নয়। শুধুমাত্র ছিল এক নিঃশব্দ বোঝাপড়া-- বন্ধুত্বের।
মনের সব ভালোবাসাই যে প্রেম হবে, তা নয়। বন্ধুত্বের সম্পর্কেও ভালোবাসা থাকে সেখানেও প্রেম জন্ম নেয়।
দূরে ক্যাফে থেকে সুর ভেসে আসে---
" আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরান সখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ-সম, নাই যে ঘুম নয়নে মম--
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার।।"
---- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com