*(আষাঢ়ের প্রথম দিনে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটি হাতি খেলা করছে।)* > কালিদাসের এই বর্ষা প্রেমিকের জন্য মিলনের আনন্দ নিয়ে আসেনি, এনেছিল দূর প্রিয়ার কাছে মেঘের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর ব্যাকুলতা। বর্ষার মেঘ এখানে এক নিঃসঙ্গ হৃদয়ের দূত, যে প্রেমকে কাঁদায় কিন্তু সেই কান্নাতেই প্রেমকে অমর করে রাখে। কালিদাসের পর বর্ষা আর প্রেম এক অন্য মাত্রা পেল মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতে। এখানে বর্ষা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, তা হলো রাধার অভিসারের পটভূমি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, চারদিক অন্ধকারে ঢাকা, আর সেই দুর্যোগের মধ্যেই রাধা চলেছেন তাঁর কৃষ্ণের খোঁজে। কবি বিদ্যাপতির সেই বিখ্যাত পদটি মনে পড়ে: > **"এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, / শূন্য গেহ মোঁর।"** > ভাদ্র মাসের এই ভরা বর্ষায় যখন চারদিক জলে থৈথৈ, তখন প্রিয়া ছাড়া ঘর শূন্য, মন উচাটন। আবার কবি গোবিন্দদাস যখন লেখেন— **"কণ্টক গাড়ি কমল-সম পদতল মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি..."**, তখন বোঝা যায় প্রেমের টান কতখানি তীব্র হলে একটা মেয়ে বর্ষার কর্দমাক্ত পথ, বজ্রপাত আর সাপখোপের ভয় উপেক্ষা করে অভিসারে বের হতে পারে। বর্ষা এখানে প্রেমের অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে জল ঢেলে আগুন নেভানো যায় না, বরং প্রেমের আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। বর্ষা নিয়ে লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দেওয়া মানে তো মেঘ ছাড়া বৃষ্টির কল্পনা করা। রবীন্দ্রনাথের কাছে বর্ষা ছিল তাঁর প্রাণের ঋতু। তাঁর প্রেম আর বর্ষা যেন একই সুরে বাঁধা। তিনি যখন লেখেন: > **"এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায়।"** > তখন বোঝা যায়, মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা যে কথাটি অন্য কোনো দিন বলা যায় না, বর্ষার মেঘলা আকাশ সেই সংকোচটুকু ধুয়ে দিয়ে মনকে সাহসী করে তোলে। রবীন্দ্রনাথে বর্ষা যেমন মিলনের গান গায়, তেমনি বিরহের সুরেও বুক ভাঙার শব্দ শোনায়। **"আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে"** কিংবা **"হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে"**— এর প্রতিটিতেই প্রকৃতির সাথে মনের ভেতরের প্রেমিকের এক অদ্ভুত কথোপকথন চলে। রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিরা বর্ষা ও প্রেমকে একটু অন্য চোখে দেখতে শুরু করলেন। সেখানে কেবল বিরহের কান্না নেই, আছে এক তীব্র নাগরিক একাকীত্ব, হারানোর হাহাকার আর বৃষ্টির শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গোপন প্রেম। কাজী নজরুল ইসলামের গানে বর্ষা আর প্রেম এক উদাসীন সুর তৈরি করে। বিরহের তীব্রতা বোঝাতে তিনি লিখেছিলেন: > **"শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে / বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে..."** > আধুনিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বর্ষাকে দেখেছিলেন শহরের প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রেম আর বৃষ্টির মিলন ঘটে ট্রামলাইনের চেনা রাস্তায়। তিনি লেখেন: > **"হঠাৎ বৃষ্টি। একঝাঁক পাখি উড়ে গেল আকাশের খোঁজে। / আমরা দুজনে এক ছাতার নিচে, পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে এলো।"** > আবার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন লেখেন, তখন বর্ষা হয়ে ওঠে ভেজা স্মৃতির এক গভীর চাদর: > **"বৃষ্টি পড়ে এখানে ওখানে, বৃষ্টি পড়ে মনের ভেতরে। / তুমি তো জানো না কতখানি ভিজলে মানুষ একা হয়ে যায়।"** > কবি জয় গোস্বামীর কলমে বর্ষা যেন এক নিঃশব্দ অভিমান, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা মনের গোপন কথাগুলো বলে দেয়: > **"মেঘ বালিকার জন্য রূপকথা... / সে কি জানে কতটা জল জমলে পরে চোখের জলও বৃষ্টি হয়ে ঝরে?"** > আধুনিক প্রেম কেবল ডুকরে কাঁদে না, সে বৃষ্টির শব্দের আড়ালে নিজের একাকীত্বকে লুকিয়ে ফেলে। আজ আর মেঘকে দূত বানিয়ে চিঠি পাঠানো হয় না ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টির দিনে জানলার কাচে আঙুল ছুঁয়ে প্রিয় মানুষের অবয়ব খোঁজার আকুলতা একটুও কমেনি। বসন্তকে যদি প্রেমের ঋতু বলা হয়, তবে বর্ষা হলো সেই প্রেমকে গভীরে নিয়ে যাওয়ার ঋতু। বসন্তে থাকে চপলতা, রঙের মেলা, আর দেখানোর আনন্দ। কিন্তু বর্ষায় থাকে এক অদ্ভুত অন্তর্মুখিতা। বৃষ্টি যখন বাইরের পৃথিবীকে একটা ঝাপসা পর্দায় ঢেকে দেয়, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ভেতরের দিকে তাকায়। আর সেই ভেতরেই তো বাস করে ভালোবাসা। বর্ষার প্রেম মানে একটা ছাতার নিচে দুজনের কাঁধ ভিজে যাওয়া, বর্ষার প্রেম মানে এক কাপ গরম চা আর জানলার কাচে আঙুল দিয়ে প্রিয় মানুষের নাম লেখা। বৃষ্টির শব্দে যেন সব শব্দ ডুবে যায়, শুধু বেঁচে থাকে দুটি হৃদয়ের স্পন্দন। তাই বলা যায়, কবি-লেখকদের লাইন ধরে যে বর্ষা ও প্রেমের যাত্রা শুরু হয়েছিল শত বছর আগে, তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। কাগজের নৌকা যেমন জলের টানে ভেসে যায়, তেমনি বর্ষা এলেই মানুষের মনও কোনো এক চেনা বা অচেনা প্রেমের টানে উজান বইতে শুরু করে। মেঘের ডাক আসলে হৃদয়েরই ডাক, যা বারবার মনে করিয়ে দেয়— প্রেম ছাড়া এই মানবজীবন বড্ড শুষ্ক, বড্ড তৃষ্ণার্ত।"/>
Logo
logo

সাহিত্য / কবিতা

প্রবন্ধ-জলছবির ক্যানভাসে হৃদয়ের কথকথা

বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণে যদি কোনো একটি ঋতুকে হৃদয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি আসন দিতে হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বর্ষা। আর এই বর্ষার সঙ্গে যার নাড়ির যোগ, তা হলো প্রেম। বর্ষা আর প্রেম— এ যেন একই মুদ্রার দুটি পিঠ। একটির আবাহনে অন্যটির জাগরণ অবধারিত। মেঘের গুরুগুরু ডাকে যেমন ময়ূর নেচে ওঠে, তেমনি মানবহৃদয়ের সুপ্ত কোণে জমে থাকা মেঘের দলও বৃষ্টির স্পর্শে ভালোবাসার কান্নায়, কখনো বা আনন্দের প্লাবনে ভেসে যায়। যুগ যুগ ধরে কবি ও লেখকেরা এই বর্ষা আর প্রেমকে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দিয়েছেন। তাঁদের কলমে বর্ষা কেবল এক ঋতু নয়, বর্ষা হলো প্রেমের এক অন্য রকম অনুভূতি
বাঙালি তথা ভারতীয় সাহিত্যে বর্ষা ও প্রেমের প্রথম সার্থক মেলবন্ধন ঘটেছিল মহাকবি কালিদাসের হাত ধরে। তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘মেঘদূতম্’-এ আষাঢ়ের প্রথম দিনে মেঘ দেখে যক্ষের বুকের ভেতর প্রিয়ার জন্য যে আকুলতা জেগে উঠেছিল, তা-ই সাহিত্যের ইতিহাসের চিরন্তন বিরহের রূপকথা। কবি লিখেছিলেন:
> **"আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং / বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং دদর্শ।"**
> *(আষাঢ়ের প্রথম দিনে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটি হাতি খেলা করছে।)*
>
কালিদাসের এই বর্ষা প্রেমিকের জন্য মিলনের আনন্দ নিয়ে আসেনি, এনেছিল দূর প্রিয়ার কাছে মেঘের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর ব্যাকুলতা। বর্ষার মেঘ এখানে এক নিঃসঙ্গ হৃদয়ের দূত, যে প্রেমকে কাঁদায় কিন্তু সেই কান্নাতেই প্রেমকে অমর করে রাখে।
কালিদাসের পর বর্ষা আর প্রেম এক অন্য মাত্রা পেল মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতে। এখানে বর্ষা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, তা হলো রাধার অভিসারের পটভূমি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, চারদিক অন্ধকারে ঢাকা, আর সেই দুর্যোগের মধ্যেই রাধা চলেছেন তাঁর কৃষ্ণের খোঁজে। কবি বিদ্যাপতির সেই বিখ্যাত পদটি মনে পড়ে:
> **"এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, / শূন্য গেহ মোঁর।"**
>
ভাদ্র মাসের এই ভরা বর্ষায় যখন চারদিক জলে থৈথৈ, তখন প্রিয়া ছাড়া ঘর শূন্য, মন উচাটন। আবার কবি গোবিন্দদাস যখন লেখেন— **"কণ্টক গাড়ি কমল-সম পদতল মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি..."**, তখন বোঝা যায় প্রেমের টান কতখানি তীব্র হলে একটা মেয়ে বর্ষার কর্দমাক্ত পথ, বজ্রপাত আর সাপখোপের ভয় উপেক্ষা করে অভিসারে বের হতে পারে। বর্ষা এখানে প্রেমের অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে জল ঢেলে আগুন নেভানো যায় না, বরং প্রেমের আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে।
বর্ষা নিয়ে লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দেওয়া মানে তো মেঘ ছাড়া বৃষ্টির কল্পনা করা। রবীন্দ্রনাথের কাছে বর্ষা ছিল তাঁর প্রাণের ঋতু। তাঁর প্রেম আর বর্ষা যেন একই সুরে বাঁধা। তিনি যখন লেখেন:
> **"এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায়।"**
>
তখন বোঝা যায়, মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা যে কথাটি অন্য কোনো দিন বলা যায় না, বর্ষার মেঘলা আকাশ সেই সংকোচটুকু ধুয়ে দিয়ে মনকে সাহসী করে তোলে। রবীন্দ্রনাথে বর্ষা যেমন মিলনের গান গায়, তেমনি বিরহের সুরেও বুক ভাঙার শব্দ শোনায়। **"আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে"** কিংবা **"হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে"**— এর প্রতিটিতেই প্রকৃতির সাথে মনের ভেতরের প্রেমিকের এক অদ্ভুত কথোপকথন চলে।

রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিরা বর্ষা ও প্রেমকে একটু অন্য চোখে দেখতে শুরু করলেন। সেখানে কেবল বিরহের কান্না নেই, আছে এক তীব্র নাগরিক একাকীত্ব, হারানোর হাহাকার আর বৃষ্টির শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গোপন প্রেম।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে বর্ষা আর প্রেম এক উদাসীন সুর তৈরি করে। বিরহের তীব্রতা বোঝাতে তিনি লিখেছিলেন:
> **"শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে / বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে..."**
>
আধুনিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বর্ষাকে দেখেছিলেন শহরের প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রেম আর বৃষ্টির মিলন ঘটে ট্রামলাইনের চেনা রাস্তায়। তিনি লেখেন:
> **"হঠাৎ বৃষ্টি। একঝাঁক পাখি উড়ে গেল আকাশের খোঁজে। / আমরা দুজনে এক ছাতার নিচে, পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে এলো।"**
>
আবার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন লেখেন, তখন বর্ষা হয়ে ওঠে ভেজা স্মৃতির এক গভীর চাদর:
> **"বৃষ্টি পড়ে এখানে ওখানে, বৃষ্টি পড়ে মনের ভেতরে। / তুমি তো জানো না কতখানি ভিজলে মানুষ একা হয়ে যায়।"**
>
কবি জয় গোস্বামীর কলমে বর্ষা যেন এক নিঃশব্দ অভিমান, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা মনের গোপন কথাগুলো বলে দেয়:
> **"মেঘ বালিকার জন্য রূপকথা... / সে কি জানে কতটা জল জমলে পরে চোখের জলও বৃষ্টি হয়ে ঝরে?"**
>
আধুনিক প্রেম কেবল ডুকরে কাঁদে না, সে বৃষ্টির শব্দের আড়ালে নিজের একাকীত্বকে লুকিয়ে ফেলে। আজ আর মেঘকে দূত বানিয়ে চিঠি পাঠানো হয় না ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টির দিনে জানলার কাচে আঙুল ছুঁয়ে প্রিয় মানুষের অবয়ব খোঁজার আকুলতা একটুও কমেনি।
বসন্তকে যদি প্রেমের ঋতু বলা হয়, তবে বর্ষা হলো সেই প্রেমকে গভীরে নিয়ে যাওয়ার ঋতু। বসন্তে থাকে চপলতা, রঙের মেলা, আর দেখানোর আনন্দ। কিন্তু বর্ষায় থাকে এক অদ্ভুত অন্তর্মুখিতা। বৃষ্টি যখন বাইরের পৃথিবীকে একটা ঝাপসা পর্দায় ঢেকে দেয়, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ভেতরের দিকে তাকায়। আর সেই ভেতরেই তো বাস করে ভালোবাসা।
বর্ষার প্রেম মানে একটা ছাতার নিচে দুজনের কাঁধ ভিজে যাওয়া, বর্ষার প্রেম মানে এক কাপ গরম চা আর জানলার কাচে আঙুল দিয়ে প্রিয় মানুষের নাম লেখা। বৃষ্টির শব্দে যেন সব শব্দ ডুবে যায়, শুধু বেঁচে থাকে দুটি হৃদয়ের স্পন্দন।
তাই বলা যায়, কবি-লেখকদের লাইন ধরে যে বর্ষা ও প্রেমের যাত্রা শুরু হয়েছিল শত বছর আগে, তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। কাগজের নৌকা যেমন জলের টানে ভেসে যায়, তেমনি বর্ষা এলেই মানুষের মনও কোনো এক চেনা বা অচেনা প্রেমের টানে উজান বইতে শুরু করে। মেঘের ডাক আসলে হৃদয়েরই ডাক, যা বারবার মনে করিয়ে দেয়— প্রেম ছাড়া এই মানবজীবন বড্ড শুষ্ক, বড্ড তৃষ্ণার্ত।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com