প্রবন্ধ - প্রকৃতি উপাসক রবীন্দ্রনাথ
"হৃদয় আজি মোর কেমনে গেলো খুলি,
জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি "।
রবীন্দ্রনাথ ও প্রকৃতি ---একে অন্যের ছায়া ও কায়া। রবির কিরণ যেমন পৃথিবীর প্রাণ স্বরূপ, তেমনি রবি কবি ও প্রকৃতি,,,, একে অন্যের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর চেতনায়,,,,,"প্রকৃতি,, এক অনন্ত প্রসারিত বাহির, যাহা আমার অজানা অথচ দ্বার - জানালার ফাঁক
ফোকর দিয়া আসিয়া আমাকে ছুঁইয়া যাইতো। সে ছিলো মুক্ত, আমি ছিলাম বদ্ধ, মিলনের উপায় ছিলোনা অথচ প্রণয়ের আকর্ষণ ছিলো প্রবল "।
সেই শৈশব থেকেই ছোট রবির,,, "প্রকৃতির প্রতি এক অমোঘ টান "--তাঁর লিখিত আত্ম জীবনী 'ছেলেবেলার কথা ' তে পাই। প্রকৃতি তাঁর লেখার রসদ,, প্রেরণা জুগিয়েছে। দোতলার বারান্দায় বসে ছোট্ট রবি,, পুকুরের জলে নারকেল পাতার প্রতিচ্ছবিতে যে হিল্লোল দেখেছিলো,,তার ই প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতায়,। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে নিঃশেষে সোঁপে দিয়ে, অন্তরের মাঝে তাকে অনুভব করছিলেন। এই পরম অনুভূতি কেই তো স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি তে লাগিছেন। "ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি, আছে আমাদের পাড়া খানি,,,"। বাবার সাথে ট্রেন ভ্রমণে ,, তার কল্প লোকে ধরা পড়েছে,,, গাছ পালা,, ঘর বাড়ি সব ছুটে চলেছে,,, এরই মাঝে "ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রাম গুলি।
বীরভূমের লালমাটির রঙে মন রাঙিয়েছেন,,,,"গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ,,, আমার মন ভুলায় রে "। ইট,, কাঠ,, পাথরের এই শহরে বসে ঐ গানের দৃশ্য পট আমাদেরও মন ভুলায় বৈকি। স তৃষ্ণ মন, বাউলের একতারার সুরের সাথে সাথে অদেখা সবুজ বনানী ঘেরা রাঙা মাটির পথে পথে ঘুরে যে বেড়ায়। একে আগলে রাখার সাধ্য কি?।।
শুধুই কি গাছপালা,,,? নদ নদী,, পাহাড়,, ঝর্ণা,, তাঁর প্রকৃতি প্রেমের দুয়ারে হানা দিয়েছে।"নদী আপন বেগে পাগলপারা ",,, । বন জঙ্গলে,,,জ্যোৎস্না রাতের সৌন্দর্য,,অবিরাম বৃষ্টি তে তাঁর হৃদয় "ময়ূরের মতো নেচে "উঠেছে। কবির ভাষায়,, এক অপরূপ মহিমায় বিশ্ব সংসার সমাচ্ছন্ন। আনন্দ ও সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরোঙ্গাইত। এই ভাবাবেগ ইত "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ " কবিতার উৎস। তিনি প্রকৃতিকে পটভূমি হিসাবে নয় -- তাঁর ভাবনার উৎস তথা লেখনীর প্রাণ শক্তির উপদান হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবর্তন শীলতা --তিনি প্রাণ ভরে উপভোগ করেছেন,, যা তিনি মুখের নিঃসৃত বাণী তে প্রকাশ ঘটিয়েছেন,,, "প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে, মোরে আরো আরো দাও প্রাণ,, তব ভুবনে,,"।।
কবি বিশ্বাস করতেন,, যে, প্রকৃতি আমাদের মনকে প্রভাবিত করে,,, প্রতিটি মানুষের মনে অধ্যাত্মিকতা, প্রেম, ও মানবিক মূল্যবোধ ঘটায়। তাইতো বলাই গল্পে দেখি,,, বলাইয়ের পোঁতা গাছটি কেটে ফেলায়, তার কি করুন পরিণতি। প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনের এক আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান -- তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন,, বিভিন্ন স্বাদের ভিন্ন ভিন্ন লেখায়। এই অনুভূতিকেই সঙ্গী করেই তিনি প্রকৃতি ও শিক্ষার মধ্যে এক মেল বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। সৃষ্টি করছিলেন,, প্রকৃতির মাঝে পাঠাশালা,,,, শান্তিনিকেতন। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে, আশ্রমিক পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা ও মনের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন,, চার দেওয়ালে আবদ্ধ থেকে নয়, খোলা আকাশের নিচে, গাছের তলায় সবুজ ঘাসে বসে পড়াশুনা, ঘন্টার ধ্বনিতে নয়,,পাখিদের কলতানে, কুহুর আওয়াজে,, পড়ুয়াদের মন ছুটির ডানা মেলুক,,,, কচি কণ্ঠে কলতান উঠুক,,,"মেঘের কোলে রোদ উঠেছে,,, আজ আমাদের ছুটি "। মেকি রঙে নয়,,,, অশোক,, পলাশ,,, শিমুলের রঙে,, নাচে গানে,, প্রকৃতির সাথে রেঙে উঠুক বসন্ত উৎসবে।
তিনি বিশ্বাস করতেন,,,, প্রকৃতির মধ্যে থেকে যে আনন্দ, শিক্ষা, খুঁজে পাওয়া যায়,,, তা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানবিক গুনাবলীর বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। তাই প্রকৃতি কে ভালোবাসা, তার যথাযথ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। গুরুদেব যে সমৌ
এর মাঝেই এই কথাটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার,,,,কবি যে সময় প্রকৃতি পাঠশালা ও তার সুরক্ষার কথা বলেছিলেন,,,, সেই সময় কিন্তু অধুনা "পরিবেশ বাঁচাও "আন্দোলন দানা ই বাঁধেনি। তাই প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্টতা, সুরক্ষা, ভালোবাসা --এ যে তাঁরই অবদান।।
শুধু শ্যামল প্রকৃতি নয়,,,, শুস্ক,, রুক্ষ,, বিধ্বস্ত প্রকৃতির মাঝেও রবির প্রভাব অপরিসীম। প্রখর গ্রীষ্মে যখন "দারুন অগ্নি বানে " আবার " ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে",,, সতৃষ্ণ নয়নে জানালায় চোখ রাখা। নব যৌবন বর্ষায়,, "আউসের ক্ষেত জলে ভরো ভরো ",,, এ সবই তো তাঁর প্রকৃতির প্রতি একাত্মতা।।
ঋতু বৈচিত্রে প্রকৃতির প্রভাব,,,, তার প্রতিফলন,, প্রেমিক,, তথা উপাসক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়।"ঘাসের আগায় শিশির বিন্দু "--শরতের আভাস, নতুন ধানের পরবে হেমন্তের ও অথবা "শীর্ণ বৃক্ষ শাখা যত ফুল পত্র হীন,, শীতের বৈরাগ্য রূপ।ঋতুরাজের আগমন বার্তা ঘোষণা করে,,"ফাগুন লেগেছে বনে বনে "।।
কবির দৈনন্দিন জীবনে এবং সাহিত্যেকর্ম আমরা যদি সেভাবে হৃদয়ে উপলব্ধি করতে পারি,,, তাহলে বুঝতে পারবো --প্রকৃতির সাথে তাঁর এক নিবিড় সম্পর্ক,গড়ে উঠেছিল,,,, যা আমৃত্যু পর্যন্ত কবির সাথে রয়ে ছিলো। সন্ধান পেয়েছিলেন,,, "এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয় "।করছিলেন,, প্রকৃতির নানা বিষয় নিয়ে, তাঁর এই ভাবনা এই ভাবনা,, অনুভূতি,, বাংলা সাহিত্যে আজও শীর্ষ স্থান দখল করে আছে।।
আমরা প্রকৃতি প্রেমী মানুষেরা,,"প্রকৃতির মাঝে রবীন্দ্রনাথ কে, আবার রবির জ্ঞানের আলোয় প্রকৃতিকে" অনুভব করতে শিখেছি।
তাই আমার বিশ্বাস, অনুভূতি তে "প্রকৃতি উপাসক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "সতত বিরাজমান।।
