গল্প -অপূর্ন ভালোবাসার সমাপ্তিকরণ
শরতের নীল আকাশে হঠাৎ করে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে, মনটা হয়েছে উদাস, কেন জানি না বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে তোমার সেই হাসিমাখা মুখখানি। আদরে যত্নে রাঙিয়ে থাকতো দিনগুলো, জানি ফেরত পাব না, সময় কোনদিনই ফেরত দেয় না। এটা কি আমার প্রাপ্তি ছিল বৃষ্টি? এক নিঃশ্বাসে ফোনের অপর প্রান্তে কথাগুলো বলল- মেঘ
সময় বদলেছে, বদলেছে পরিস্থিতি। বদলে গেছি আমি, তুমি বদলেছে কিনা জানিনা, দেখা নেই দুজনের মধ্যে আজ এক যুগ হয়ে গেল। তোমার দীর্ঘ নিঃশ্বাস আমাকে আরো উদাসীন করে দেয় বৃষ্টি! কিছুতো বলো;
শুনতে বড় ইচ্ছা করে তোমার কথা, তাইতো প্রতিউত্তর কিছুই দিতে পারি না- বৃষ্টি কিছুটা উদাসীন হয়েই বলল মেঘকে ।
নটা-ছটার ডিউটি শেষে বাড়ি, মায়ের হাটুর ব্যথাটা না আবার বেড়েছে। বাবার স্পন্ডালাইসিস ধরা পড়েছে আজ বছর দুয়েক। আমার ছেলে মেয়ে দুটো না পড়াশোনায় খুব ব্রাইট। ঠিক জানি না পড়াশোনার দিক থেকে কাদের উপর দিয়ে গেছে তারা? আমি তো এত ভাল পড়াশোনায় কখনোই ছিলাম না। তোমার থেকে সেটা ভালো কেউ জানতোই না বৃষ্টি। তোমার কত গুন ছিল। এক ঝটকায় অতীতের ওই দিনগুলোতে ফিরে যায় মেঘ আর বৃষ্টি। আচ্ছা বৃষ্টি বাগবাজারের ঘাটে বসে থাকার দিনগুলোর কথা তোমার মনে পড়ে? হাতে ঝাল মুড়ির প্যাকেট নিয়ে আর দু কাপ ভাড়ের চা কতটা সময় কেটে যেত না আমাদের।ঘড়ির কাটাতে কখন যে নটা বেজে যেত খেয়ালই হত না। তোমার মায়ের ফোনটা আসার পর ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখতাম নটা বেজে গেছে। চাইলেও হয়তো আর কিছুক্ষণ বসা যেত না কারণ তোমার বাড়ির কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা তোমাকে কোথাও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। আমার মনটা না খুব চাইত জানো আরো কিছুক্ষন তোমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকি আর তুমি অনর্গল কথা বলে যাও। সেটা হয়তো কখনোই হয়ে উঠবে না আমাদের এই সংকীর্ণ জীবনে।
তারা মাঝে মাঝে আমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার কথা। তারাকে আমি কোনদিনই কোন কিছু লুকাইনি, তার কারণ লুকিয়ে যদি সম্পর্কটা তৈরি করতাম তার সাথে তাহলে হয়তো তাকে কোথাও গিয়ে ধোঁকা দেয়া হতো। তারাও কিন্তু কখনো আমার অতীত নিয়ে কোন প্রশ্ন করেনি।
সেদিন হঠাৎ ঘর গোছাতে গোছাতে তারা তোমার দেওয়া সেই ডায়েরী টা খুঁজে পায় যেটাতে কোন এক সময় নিজের মনের কথাগুলো যেগুলো তোমাকে বলতে পারতাম না সেগুলো ফিরে এসে লিখে রাখতাম।তারা হয়তো একটা- দুটো পাতা পড়েছিল। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরলে তারা ডায়েরিটা আমার হাতে দিয়ে বলল মেঘ এই উপহারটা খুব মূল্যবান, এটাকে হারিয়ে ফেলো না। আমি না সেদিন তারার চোখে একটা বিষন্নতা দেখেছিলাম
মনে হয়েছিল কোথাও গিয়ে তারা হয়তো কষ্টে আছে, হয়তো সে মুখ ফুটে আমাকে বলতে পারেনা যে তুমি কি আজও বৃষ্টিকে ভালোবাসো?
হয়তো সে কোথাও কুন্ঠিত বোধ করে।আমি তারার হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে ছল ছল চোখে একবার তার দিকে তাকিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। তারা শুধু বলল অনেকটা রাত হয়ে গেছে চলো এবার খেয়ে নি।
আমি জানিনা তোমার জীবনটা কোন ধারায় বয়ে চলেছে। কিভাবে তুমি সবকিছুকে ভুলে গিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছো নিজেকে, তবে এটা কিন্তু আমি জানি ভালোবাসার প্রথম পরশ তোমাকে কোনদিন আমাকে ভুলতে দেবে না।
শোনো না মেঘ, আকাশ না এক্ষুনি চলে আসবে গো, আজকে আসি পরে সময় করে তোমায় আমি ফোন করবো।- এই কথাটা বলেই বৃষ্টি ফোনটা কেটে দিলো।
ফোনটা হাতে নিয়ে মেঘ অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সম্বিত ফিরলো ছেলের ডাকে। বাবা আজকে না তোমার আমার সাথে আমার প্রজেক্ট করার দিন। চলো দুজনে মিলে প্রজেক্ট করি। ছেলের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে রোজকারের জীবন মাচায় ফিরল মেঘ।
বৃষ্টি ফোনটা রাখার পর ভালোবাসার অপূর্ণতা কতটা কষ্ট দেয় সেটা চিন্তা করতে করতে হুইল চেয়ারটা নিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। কোনদিনও সে মেঘকে জানতেই দেয় নি সোজা হয়ে হাটার ক্ষমতা সে হারিয়েছে আজ ১৪ বছর। তাই জন্যই সে নিজেকে সব থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল মেঘের জীবন থেকে। মেঘ যাতে কষ্ট না পায় তাকে দেখে, তাই সে কখনোই কলকাতায় ফিরেও মেঘের সাথে দেখা করে নি।
ভালোবাসার অপূর্ণতা মানুষকে শেখায় অনেক কিছু। বাঁচার মতো একটা আশ্রয় যদি খুঁজে পাওয়া যায় জীবনটা হয়তো কেটে যায়। কিন্তু সময় তো সেই জায়গায় থমকে দাঁড়ায় যেখানে ভালোবাসাটা পূর্ণতা পেয়েছিল কখনো একসময়।।
