Logo
logo

সাহিত্য / কবিতা

শারদীয়ার সাতকাহন

মেঘে একগুচ্ছ নরম পেঁজা তুলোর ভেলা, বাতাসে শিউলি ফুলের সুবাস, দমকা হাওয়ায় কাশফুলের ক্ষণিক দুলুনি জানিয়ে দেয় শরৎ এসেছে। পুজোর সাতদিন আগে থেকে বাঙালির ঘরে ঘরে বেজে ওঠা আগমনীর সুর আর প্যান্ডেলে প্রতিমা স্থাপনের কিঞ্চিৎ ব্যবধানটাই বড় মধুর। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে দুর্গা পূজার আকর্ষণ সত্যি আলাদা। দেবীপক্ষের সূচনা হয় মহালয়া থেকে আর অন্তিম কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো অবধি। দেবীপক্ষের দূর্গাপুজো বাঙালির ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ কিভাবে হয়ে গেলো তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় "অকালবোধন"। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীর প্রধান তিন গল্প অনুযায়ী প্রথমে মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুর বধ, দ্বিতীয় ভাগে মহিষাসুর বধ এবং শেষ ভাগে আছে শুম্ভ নিশুম্ভ বধে আবির্ভূত হন। এতে কথিত আছে রাজা সুরথ যবন জাতির কাছে তার রাজ্য হারিয়ে ফেলে তাই মনের দুঃখে বনে চলে যান। সেখানে মেধা নামের এক ঋষির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেখানে রাজাকে তিনটি গল্প শোনান। সেই গল্প শুনে তিনি তিন বছর কঠিন তপস্যা করেন এবং তার রাজ্য পুনুরুদ্ধার করেন। অতঃপর বাঙালির জীবনে দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে মহাপুজোতে
পরিণত হয়ে ওঠে। একে মহাপুজা বলা হয় কারণ এতে স্নান, পূজন, হোম ও বলিদান এই চারটি কর্ম জড়িত। প্রথমে শুধু দুর্গা দেবীর পূজা হত। কিন্তু ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ন রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দেবী দুর্গাকে সপরিবারে পুজো করা শুরু করেন। দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে যায় মহালয়ার দিন থেকে অর্থাৎ পিতৃপক্ষের অবসান দিয়ে। এই তিথিতে পূর্বপুরুষ কে স্মরণ করে, আত্মার শান্তি কামনা করে। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত দুর্গাপূজা পালিত হয়। দুর্গাপুজোর চার-পাঁচটা দিন নবপত্রিকা স্নান দিয়ে শুরু হয়ে চণ্ডীপাঠ, মন্ত্রপাঠ, সন্ধি পূজা, চালকুমড়ো বলি থেকে কুমারীপূজা অর্থাৎ অরজঃস্বলা কুমারী মেয়েকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা, আয়নায় মায়ের প্রতিবিম্ব দেখে বরণ করা, সিঁদুর খেলা শেষে বিসর্জন ইত্যাদি বিভিন্ন রীতিনীতির মাধ্যমে পুজো সম্পন্ন হয়। প্রথমে ধনী বনেদি পরিবার গুলোতেই শুধু পুজো হত তা ধীরেধীরে একটি অঞ্চলের বাসিন্দা মিলে যখন করা শুরু করলো তখন সেটা বারোয়ারী বা সর্বজনীন নামে পরিচিত হল। সবশেষে এটাই বলবো একরাশ আবেগ আর ভালোবাসা মাখানো উত্তেজনা নিয়ে প্রতিবছর বাঙালি দুর্গাকে ভগবান রূপে নয় ঘরের মেয়ে রূপে দেখেছে, অপেক্ষা করেছে তার বাপের বাড়ি আসার। আনন্দাশ্রুতে শ্বশুরালয়ে বিদায় জানিয়েছে, চেয়েছে যেনো ঘরে ঘরে প্রতিটা মেয়ে দুর্গা রূপে শক্ত হাতে সমাজের সমস্ত কলুষতাকে বিনাশ করে আবার নরম কোমল হাতে সমাজের ভালোগুলোকে নিপুণ হাতে গুছিয়ে রাখতে পারে। তাই দুর্গাপুজো শুধু আনন্দমুখর উৎসব নয়, শুধু ধর্মীয় পুজো-পার্বণ নয়, দুর্গা পুজো নারী দিবসের উৎযাপন ও বটে।

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com