Logo
logo

গল্প / কাহিনী

ভাগ্যের পরিহাস

ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ এই বাংলা। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকে। এর মধ্যে দুর্গোৎসব হলো শ্রেষ্ঠ উৎসব। শরৎকালে এই পুজো হয়। গাছে গাছে শিউলি ফুলের সম্ভার, আকাশে ভেসে বেড়ায় শ্বেতশুভ্র মেঘবলাকা, গ্রামের পথের ধারে কাশ ফুলের সমারোহ, দিঘীতে রাশি রাশি পদ্ম সবই যেন মায়ের পায়ে সমর্পণের অপেক্ষায় দিন গোনে। এই ভাবেই মায়ের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ছোট বড় সকলের মনেই থাকে খুশির আমেজ, বনেদি বাড়ির পুজো, সার্বজনীন পূজা। শুরু হয়ে যায় আগাম প্রস্তুতি। বড় বড় প্যান্ডেল, চোখ ধাঁধানো আলোক সজ্জা, আর সুন্দর সুন্দর ডাকের সাজের প্রতিমা, মন্ডপ আলো করে থাকে।
দুর্গাপূজা এমন উৎসব যেখানে সব রকম সামগ্রী লাগে। যেমন প্রতিমা গড়ার জন্য কুমোরের মাটি থেকে শুরু করে রঙ, সোলার কাজ, কাপড় চুল আরো কত কী। এই পূজাকে কেন্দ্র করে ছোট বড় সকল প্রকার ব্যবসায়ীরা লাভের চেষ্টা করেন। এমন কোনো সামগ্রী নেই যা এই পূজাকে উপলক্ষ্য করে লাগে না। পোষাক আশাক, জুতো ,গহনা কী নেই এই তালিকায়। ফুল চাষিরা নানা রকম ফুল বিক্রি করে কিছু অর্থ উপার্জন করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়। দিনের সাথে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে থিমের পূজা। সাবেকী ঠাকুরও হয়। তবে এই সব থিমের পূজার জন্য অনেক দিন আগে থেকেই বড় বড় প্যান্ডেল তৈরি হয় কলকাতার বুকে। এই সব প্যান্ডেলের শ্রমিকরা সামান্য মজুরিতে পরিবার ছেড়ে দিনের পর দিন প্রানের ঝুঁকি নিয়ে উঁচু উঁচু বাঁশের উপর উঠে কাজ করে। আমরা দেখে আপ্লুত হই। দেশ বিদেশের মন্দিরের আদলে গড়ে ওঠে প্যান্ডেল। এই সমস্ত প্যান্ডেলগুলোকে আরো সুন্দর লাগে যখন আলোক সজ্জায় সেজে ওঠে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কত রকমের রোশনাই বাতি, বড় বড় ঝাড়বাতি, এলিডি বাতিতে সেজে ওঠে, শহর থেকে শহরতলীর রাজপথ। অন্ধকারকে মুছে দিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাবার এক নব পদক্ষেপ। এই চারটি দিনের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হয় নির্দিধায়।
কিন্তু এই আলো যারা জ্বালে তাদের জীবন থাকে অন্ধকারের অতলে। এই রকম এক শ্রমিকের গল্প বলবো আজ।
প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন বিমল মন্ডল। এক মেয়ে, এক ছেলে আর বৃদ্ধা মা, স্ত্রীকে নিয়ে অভাবের সংসার। বাপ, ঠাকুরদার হাত ধরে প্যান্ডল তৈরীর কাজ শেখা। তখন বিয়ে, শ্রাদ্ধ, জন্মদিন, দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা এছাড়া যে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য প্যান্ডেল তৈরি হতো। বারো মাস কাজের অভাব ছিল না। সংসারে অভাব থাকত না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দিন বদল হতে থাকে। যে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাঙ্কোয়েট হল বা অনুষ্ঠান ভবন গড়ে ওঠে সর্বত্র। ফলে শুধুমাত্র পূজা পার্বণেই এই প্যান্ডেল শ্রমিকদের ডাক পড়ে। সারা বছর বিড়ি বেঁধে বা ছোটো খাটো কোনো কাজ করে সংসার চলে এই সমস্ত শ্রমিকদের। বিমল মন্ডল ভালো কাজ জানে, তাই তার ডাক পড়ে কলকাতার বড় বড় প্যান্ডেল তৈরির জন্য। পাঁচ ছয় মাস ধরে এই কাজ চলে। তখন কিছুটা অর্থ উপার্জন করে পরিবারকে সুখী রাখার চেষ্টা করে। মেয়েটা এই বছর মাধ্যমিক পাশ করেছে। ছেলে ক্লাস এইট। মেয়ের পড়ার খুব ইচ্ছা। কিন্তু গ্রামের মানুষ যুবতী মেয়েকে ঘরে রাখেনা। তারা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়। তা না হলে গ্রাম্য সমাজে অনেক কটুক্তি সহ্য করতে হয়। তাই বিমল এবছর মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র ঠিক করে ফেলে। তাদের দেনা পাওনা দেবার জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে কাজ করতে থাকে। বাড়িতে জানিয়ে দেয় কলকাতার প্যান্ডেল তৈরি করে যে টাকা উপার্জন করবে তা দিয়ে মেয়ের জন্য কলকাতার বড়ো দোকান থেকে লাল টুকটুকে একটা বেনারসি শাড়ি কিনে আনবে। বাড়ির সবাই খুব খুশি। সামনের অঘ্রানে তাদের আদরের মেয়ের বিয়ে। কিন্তু বাবা জানে এত অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু সারা বছরের সামান্য আয় থেকে যদি একজনকে বাদ দেওয়া যায়, তবে কিছুটা সুরাহা হয়তো হবে সংসারে। পরের ঘরে দুমুঠো ভাত কাপড় জুটে যাবে ঠিক। দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে বিমল কলকাতার উদ্দেশ্য রওনা হয়। বৃদ্ধা মা আর তার স্ত্রী বিড়ি বেঁধে ও অন্যের বাড়ি মুড়ি ভেজে সংসার চালিয়ে নেয় কষ্টেশিষ্ট। এভাবেই চলছিল গ্রামের শ্রমিকের পরিবারের দিন গুজরান। যুবতী মেয়েটা নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখে, লজ্জায় রাঙা হয়ে মুখ ঢাকে। কত রঙিন কল্পনার জাল বোনে একান্ত মাঠের ধারে, পুকুর পাড়ে বসে। কিন্তু না, বিধাতা পুরুষের ইচ্ছা ছিল অন্য, তাই একদিন বিমল যখন প্যান্ডেল বাঁধতে অনেক উঁচু একটা বাঁশের উপর ওঠে তখন হঠাৎ পা পিছলে নিচে পড়ে যায়। ক্রমাগত বৃষ্টিতে বাঁশের গায়ে জল পড়ে এই বিপত্তি। সঙ্গে সঙ্গে পূজা কমিটির সদস্যরা বিমলকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেয় কোমড়ের হাড় ভেঙে গেছে এবং মাথায় অনেক সেলাই পড়েছে তাই অবস্থা খারাপের দিকে। বিমলের বাড়িতে খবর যায় কয়েকটা দিন যমে মানুষে টানাটানির পর বিমল ইহলোকের মায়া ছেড়ে পরলোকে যাত্রা করে। তবে অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ায় মেয়ের স্বপ্নের রাজপুত্রের পরিবার। তারা সব রকম সাহায্যে করে এবং বিমলকে পছন্দের জামাই মৃত্যু শয্যায় চার হাত এক হওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার অঙ্গীকার করে।
অধরা স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিমলের মতো শ্রমিকরা হারিয়ে যেতে থাকে যুগ যুগ ধরে নিরুদ্দেশের পথে, কোন এক অচিনপুরে......

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com