Logo
logo

গল্প / কাহিনী

নিরঞ্জন

সতীশ ভট্টাচার্য পেশায় একজন অধ্যাপক।সংস্কৃত ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। পাড়ায় সবার প্রিয় সতু কাকু। সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবী ছিল তাঁর পোশাক। ওনার এক ছেলে টুবাইদা একজন ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্গালোরে চাকুরী করে। দুই মেয়ে পলিদি ও মিলিদি। পলিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগে। থাকে দিল্লিতে। মিলিদি কলেজে। সতুকাকুদের বাড়িতে বহু বছর আগে থেকে দূর্গা পুজো হয়। আগে পুজো করতেন ওনার পিতা। পরবর্তীকালে উনি নিজে দেবী দূর্গার আরাধনা করেন।বাড়ীতে ঢুকতেই বিশাল আঙিনা। বাম পাশে দাওয়াতে মন্দিরটি। কূলদেবীসহ দূর্গার আরাধনা হতো। পুজোর একমাস আগে থেকে তৈরী হতো মূর্তি বানানোর কাজ। সামনের কুমোরটুলির ছয়জন মিলে এই মূর্তি বানাতেন। তাঁদের সাথে বাড়ির সকলেই নিরামিষ খেতেন। চতুর্থীর দিন থেকে সারা বাড়ি আলোয় সেজে উঠতো। পঞ্চমীর দিন ঢাকের শব্দে চারিদিক মুখরিত হতো। কেয়া কাকিমা সকালে স্নান সেরে লাল পাড়ের গরদের শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে বড় একটা লাল সিঁদুরের টিপ পরে পুজোর নৈবেদ্য সাজানো, নারকেলের নাড়ু তৈরি, ঠাকুরের অন্নভোগ রান্না করা থেকে সব কিছু নিজে করতেন। সঙ্গে থাকতো তুতোতো ননদ, ভাজ। সতু কাকু স্পষ্ট সংস্কৃত ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ করে পুজো করতেন। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সারা বাড়িতে লোকের সমাগম হত। অষ্টমীর দিন অঞ্জলি হত। সতুকাকুর নির্দেশ ছিল কেউ যেন ভুল উচ্চারণ না করে, সেই জন্য তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করতেন। নবমীর দিন দুপুরে সারা পাড়া প্রতিবেশীর সবাই ভট্টাচার্য বাড়িতে উপস্থিত থেকে প্রসাদ গ্রহণ করতেন। পলিদি ওই সাতদিনের জন্য আসত। আর কিছু কাজ না করলেও, সবাই ঠিকমত প্রসাদ পেয়েছে কিনা সেটা পলিদি নিজে তদারকি করত আর সারা বছরের গল্প নিয়ে যেত দিল্লীতে। টুবাইদার সময় কাটত তার স্কুলের বন্ধুদের সাথে। বৌদি শাড়ি ঠিক মত পরতে না পারলেও পুজোর কয়টা দিন শাড়িই পরত। সতুকাকু অবসর গ্রহণ করেছেন। মিলিদি বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ে। পুজোর সময় সে দুটি নতুন পোশাক পরত। বাকী পোশাকের ভাঁজ খোলার সময় পেত না। তবে এত আনন্দ আর মজা ছিল যে দেখতে দেখতে চারটি দিন কিভাবে যে কেটে যেতে বোঝাই যেত না। দশমীর দিন সকালবেলা পুজোর পরে সাড়ে এগারোটার মধ্যে পুজো শেষে দর্পন বিসর্জন হতো। আঙিনায় সিঁদুর খেলায় মেতে উঠতেন বাড়ির মহিলা থেকে পাড়ার মহিলারা। বিকালে প্রতিমা বিসর্জন করতে যেতেন সতুকাকু এবং বাড়ির সকলে মিলে। রাতে খাবার পাতে ইলিশ মাছ থাকবেই ভট্টাচার্য বাড়িতে। পরের দিন সতুকাকু একটু দেরীতেই ঘুম থেকে উঠতেন। চারদিনের ধকলে তিনি একটু ক্লান্ত হয়ে পরতেন। কেয়া কাকিমা এরপরে লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করতে ব্যস্ত থাকতেন। লক্ষ্মী পুজোর পরে নিস্তব্ধ হয়ে যেত। দীর্ঘ আড়াইশো বছরের পুজো এই ভাবেই হয়ে আসত। সালটি ছিল ২০০৭। সেই বছর মিলিদির আষাঢ় মাসের শেষে বিয়ে হওয়ার কথা। কাজেই বৈশাখ মাস থেকেই বিয়ের জিনিসপত্র কেনা শুরু হয়ে গিয়েছে। একটা সাজোসাজো রব পরিবারের সকলের। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ মাসে একদিন সকালে কেয়া কাকিমা ঘুম থেকে আর উঠলেন না। বেলা হয়ে গিয়েছে তাই মিলি তার মাকে ডাকাডাকি করে। সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। রাতে ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। সব কিছু ওলোটপালোট হয়ে গেল। সতুকাকু ও মিলিদি মানসিক আঘাত পান। মিলিদি আর বিয়ে করল না। সতুকাকু একেবারেই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পরেন। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান নোংরা ধুতি, ছেঁড়া পাঞ্জাবী, উস্কখুস্ক চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি,খালি পায়ে। টুবাইদা তার মা মারা যাবার পরে একবারই এসেছিলো, আর কোনোদিন আসে নি। মিলিদি সারাদিন কাজ কর্ম করে। সেও মানসিক অবসাদগ্রস্থ হয়ে পরেছে । ভট্টাচার্য বাড়ির বহু বছরের দেবী দূর্গার পুজো এখন পাড়ার সকলে মিলে করে। এইরকমই এক দূর্গাপুজোর দশমীর পরে প্রতিমা নিরঞ্জনের দিন প্রচন্ড ভীড় রাস্তায়। সেই ভিড়ের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলা সিঁদুর খেলার পরে নিরঞ্জনের জন্য চলেছে। সতুকাকু তাদের দেখে নিজের স্ত্রী কেয়ার কথা ভাবতে লাগলেন। সেই ভীড়ের মধ্যে দৌড়াতে শুরু করেন। প্রচন্ড ভিড়ে লোকের পায়ের তলায় চাপা পরে যান। একজন ছুটে আসেন। দেখেন তাদের সকলের প্রিয় সতীশ ভট্টাচার্য স্যার। তিনি সময় মত ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তারবাবু তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। রাতের বেলা খবর আসে তিনি ভীড়ের মধ্যে পরে গিয়ে মারা যান। সমস্ত শেষ। টুবাইদা এলো, বাবার কাজকর্ম শেষ করে সে আবার ব্যাঙ্গালোরে ফিরে যায়। আর মিলিদি কোনোদিন রান্না করে, আবার কোনোদিন করে না, অভুক্ত থেকে যায়। এখন মাথার চুল পেকে গিয়েছে, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। কেউই খোঁজ নেয় না। তবে পাড়ার কয়েকজন খোঁজখবর রাখে। এইভাবেই দিন অতিবাহিত হচ্ছে। দূর্গাপুজো এলে মিলিদির মন খুব খুব খারাপ লাগে। উদাস চোখে বাড়ির সেই দেউলটি দেখে।এখন পাড়ার প্রতিটি বাড়িতেই পুজোর সময় রঙীন আলোয় সেজে ওঠে, সকলেরই নতুন পোশাক হয়। কিন্তু ভট্টাচার্য বাড়িটি থাকে নিস্তব্ধ আলোহীন।

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com