Logo
logo

গল্প / কাহিনী

পুজোর অতিথি

এই নিয়ে চার চারটে দেখাশুনা বাতিল হল। আমি বাড়িতে একটা জিনিস কিছুতেই বোঝাতে পারছিনা যে এই ২৩ বছর বয়েসে বিয়ে আমি করব না, কিছুতেই না। কিন্তু যারা বুঝতেই চায়না তাদের বোঝাবো কেমন করে। না আমি কোনো প্রেমে ব্যর্থ হয়েছি, না আমি কোনো ডিভোর্সি বা এরকম ও নয় যে আমার বাড়িতে কেউ আমার ভালোবাসার মানুষকে মেনে নিচ্ছে না। আমার বিয়ে না করার খুব সাধারণ আর প্রত্যাশিত, তাই এই সমস্ত কারণগুলো আমার জন্য খাটে না। কিন্তু তবুও বিয়ে করব না। কখনওই না। বাড়িতে ছোটখাটো তর্ক বিবাদ করেও দিনগুলো এমনিতে বেশ ভালোই কাটছিল।
আমি একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরি করি। মাসমাইনে ভালোই। তবুও আরও উন্নতি করতে হবে। সম্মান আর টাকা দুটোই উপার্জন করতে হবে। আমি উচ্চাকাঙ্খী, তাই বিয়ে করতে এখনও অনেক দেরী। তাই বলে সারাজীবন করব না তাও বলিনি। কিন্তু ৮-১০ বছরের আগে নয়। নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নি। আর বিয়ে নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে লাভ কি। সেই তো একদিন ভালোবাসাগুলো অভ্যাস আর প্রেমগুলো আদিখ্যেতা হয়ে যাবে। এই অভ্যাস আর আদিখ্যেতার মাঝে দিনগুলো চোখের নিমেষে ফুরিয়েও যাবে। যাইহোক, বিয়ে নিয়ে বাড়ির কথায় কান না দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে হয়েছিল এবং তাই দিচ্ছিলামও ।
অন্য অনেকের মতো আমার নাচের ভীষণ শখ। বই পড়তেও খুব ভালোবাসি আর ভালোবাসি বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে। এসব নিয়েই প্রতিদিন জীবন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু বাবা মা'র বয়স বাড়ছে, তাই আমাকে নিয়ে, আমার বিয়ে নিয়ে তাদের একরাশ দুশ্চিন্তা। কিন্তু তাদের মন রাখতে আমি নিজের সঙ্গে করা কথার খেলাপ করতে পারব না, এই রকম নিমরাজি মন নিয়ে আমি যাকে বিয়ে করব তাকেও সুখী করতে পারব না। যাইহোক, এইভাবে একদিন মা বাবাও আমার বিয়ের আশা ছেড়ে দিলেন। এরকম সময় আমার গ্রামের বাড়ি থেকে বাবার দূরের সম্পর্কের একজন কাকিমা আসলেন সঙ্গে একটি ছয় বছরের নাতনি। কিছুদিন আমাদের বাড়ি রইলেন। জানতে পারলাম বিপদে পড়ে বাবার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছেন। ওনার স্বামী বহুকাল হল মারা গেছেন আর একমাত্র ছেলে গাড়ির ড্রাইভারের কাজ করে। তাদের মোটামুটি সংসার চলে যায়। একদিন নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে বউসমেত একটা অ্যাকসিডেন্টে কিছুমাস আগে গত হয়েছেন। এখন একমাত্র ভরসা এই নাতনি টি। কিন্তু এই অশীতিপর বৃদ্ধার পক্ষে নাতনিকে মানুষ করা অসম্ভব। তার উপর আর্থিক বল একদম নেই। তাই অনেক আত্মীয়ই আজ অপরিচিত হয়ে গেছেন। বাবা বললেন গ্রামের বাড়িতে প্রত্যেক মাসে তাদের জন্য টাকা পাঠাবেন। কিন্তু টাকাটাই সব নয়, কারণ ওই বৃদ্ধার একার পক্ষে এই ছোট্ট বাচ্চাটিকে দেখভাল করাও সম্ভব নয়। তাই মা অনেক ভেবেচিন্তে বললেন ওনাদের কে এখানেই থেকে যেতে। কিন্তু দিদা রাজি হলেন না। মাসখানেক থেকে চলে যাবেন মনস্থির করলেন। আমি বাচ্চাটার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টায় ছিলাম। নাম জিজ্ঞাসা করায় আধো আধো গলায় বলল "আমল নাম ধিনুক" বুঝলাম আসলে ঝিনুক। ঝিনুক খুব ছটফটে এবং বকবকে একটি বাচ্চা, ওকে দেখলেই নিজেকে দেখতে পাই, নিজের ছোটবেলাকে দেখতে পাই। অফিস থেকে ফিরেই রোজ ওর সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগছিলো। ওকে যা শেখাতাম সেগুলো ওর আধো আধো গলায় সুর জড়িয়ে এক অপার্থিব মিষ্টি কথার সৃষ্টি করত। কয়েকদিনের মধ্যেই ওর সঙ্গে আমার খুব ভাব জমে গেছিল। ওকে নাচ শেখাতাম, সাজাতাম, খাওয়াতাম, যা ইচ্ছা করত করতাম। অফিস থেকে সোজা বাড়িতে ফিরতাম, এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাটাও কমে যাচ্ছিল। কেন জানিনা ওকে না দেখতে পেলে খুব মন খারাপ হত। তাই অফিস ছাড়া বাইরে বেশীক্ষণ থাকতাম না। অল্পদিনের মধ্যেই ও আমার ন্যাওটা হয়ে গেছিল। এটা খুব সত্যি কথা বাচ্চারা যাদের থেকে ভালোবাসা পায় তাদেরকে তারাও আপ্রাণ ভালোবাসে। আমার সঙ্গে রাতে আজকাল ঘুমায়। কোনো বাচ্চার প্রতি এত টান আর ভালোবাসা এর আগে আমার কোনোদিনই ছিল না। প্রথম প্রথম তো শুধু চকলেট আর গাল টিপে দিয়েই চলে যেতাম। একটু একটু করে কিভাবে যে ও আমার এত কাছে চলে এল জানিনা। আদর, ভালোবাসা ও খুনসুঁটি জমিয়ে চলছিল। এরই মাঝে ওদের যাবার দিন ঘনিয়ে এল। আর আমার সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত আশা আকাঙ্খার আলো দপ করে নিভে গেল। অনেক অনুরোধের পরেও দিদা শহরে থাকতে চাইলেন না। গ্রামে ফিরে গেলেন। সেদিন অনেক অনেক কেঁদে ছিলাম , কিছু একটা যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন নিজের আনন্দ-সুখ গুলোকে নিজের কাছেই রাখতে পারিলাম না। বাড়ির লোকজন ও সেটা যেন উপলব্ধি করতে পারছিল। ওর অফুরন্ত হাসির আওয়াজ, সেই অপার্থিব মিষ্টি কথা, সেই নরম সুখের স্পর্শগুলো যেন আমায় বারবার তাড়া করছিল। কিছুদিন এইরকম অবস্থায় কাটানোর পর একটু একটু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলাম। মনকে সর্বদা বোঝাচ্ছিলাম ও ক্ষনিকের অতিথি। কিন্তু মন ও খুব অবুঝ বুঝেও বোঝে না। যাইহোক অফিসে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আমি বেশী করে সময় কাটাতে থাকলাম।
সাত-আট মাস কাটার পর বাবার কাছে হঠাৎ খবর এলো দিদা খুবই অসুস্থ, তাই আমাদের একবার গ্রামের বাড়ি যেতে অনুরোধ করেছেন। সামনেই দুর্গাপুজো, তাই কিছু জামাকাপড় কিনে আমরা পরদিন গ্রামের বাড়ি রওনা দিলাম। দিদার সুগার আর প্রেসার হাই ছিল, তার উপর মাইল্ড হার্ট এট্যাক। শরীরের অবস্থা এত খারাপ যে ডাক্তার দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। বাবা মনস্থির করলেন শহরে আনবেন আর কোন বারণ শুনবেন না। যতদিন বাঁচবেন উনি ওখানেই থাকবেন। আমি যেন তৎক্ষণাৎ হাতে স্বর্গ পেলাম। তার মানে ঝিনুক ও থাকবে আমাদের সঙ্গে। আমার ছোট্ট ঝিনুক আমাকে দেখেই ছুটে ঝাঁপিয়ে পরল। একে দুর্গা পুজো মানেই বাঙালির অ্যাড্রিনালিন রাশ হাই। তার উপর এবছর ঝিনুক আছে। পুজোটা অন্যবারের চেয়ে স্পেশাল তার উপর আনন্দ দ্বিগুণ। জামা কাপড়, খেলনা কিনেও মন ভরল না। বাড়ি মাথায় তুললাম আরও কী কী করা যায় ভেবে। এদিকে আজকাল লক্ষ্য করছি ঝিনুক মাঝেমাঝেই অন্য মনস্ক হয়ে পরছে। মেয়েটা খুশিতে ভাসতে চাইলেও কোন কারণে পারছেনা। অনেক কষ্টে বুঝলাম গ্রামের বাড়িতে দুর্গা পুজোর কথা ভেবে মন খারাপ করছে। বাচ্চাদের ও যে একটা মন থাকে, তাদের আবেগ থাকে, কিছু পুরোনো স্মৃতি তাদেরও মাথায় রয়ে যায় সেটা হয়ত আমরা বড়রা বুঝতে পারিনা। সব কিছু মাথায় রেখেই আমরা ঠিক করলাম এবারের পুজোয় গ্রামের বাড়িতেই যাবো। কিন্তু ঝিনুকের জন্য এটা সারপ্রাইজ রইলো। অতঃপর সপ্তমীতে ঝিনকুকে নিয়ে সপরিবারে আমরা হাজির হলাম গ্রামের বাড়িতে। চোখের নিমেষে ঝিনুকের চোখে হাজার বাতি জ্বলে উঠলো দেখলাম। শিউলি ফুলের কার্পেট বিছানো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুঠো ভরে নিঃশ্বাস নিলাম, চারিপাশে কংক্রিটের ইমারতের বদলে কাশফুলের ঝোপ আর পাখি পোকাদের আনাগোনা। সাথে সাথে মনের অক্সিজেন যেন ফিরে পেলাম। এখানে পুজোর চারটে দিন। ঝিনুকের না আছে কোনো বায়না না আছে কোনো ঝক্কি। এ যেন এক অন্য ঝিনুককে আমরা দেখলাম। বিদায়বেলা চিরকালই কষ্টের হয়। কিন্তু আজ সেই কষ্টটা যেন সুখের নয় বড়ই মন বিদারক। ঝিনুককে কোথাও খুঁজেই পাওয়া গেল না। সবাই মিলে এক তুলকালাম অবস্থা। অবশেষে ঝিলের পেছনের আম বাগানে পাওয়া গেল ঝিনুক কে । প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করে তবে শান্তি পেল। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারলেও কিছু করার ছিল না। এক প্রকার জোড় করেই আমরা বাড়ি ফিরলাম। ঝিনুকের স্কুল শুরু হল। আবার জীবনযাত্রা নিজের গতিতে এগিয়ে চললো। কিন্তু ঝিনুক খোলসের আড়ালে একেবারে লুকিয়ে গেল। আস্তে আস্তে ঝিনুক ও পাল্টে যাচ্ছিল। ওইটুকু মেয়ের মন ও বুঝে যাচ্ছিলো কিছু করার নেই তাই নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অভিনয় করছিল। আমি সব বুঝলেও কিছুই করার ছিল না। প্রতিটা মানুষের জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসে যা ইচ্ছা থাকলেও করা যায়না। এটাই নির্মম বাস্তব। তাই শক্তির আধার দেবী দুর্গার কাছে আমার প্রতিজ্ঞা ঝিনুক যা পায়নি তা আমার সাধ্যমত পূরণ করার চেষ্টা করব। আর ঝিনুকের কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম প্রতি বছর দুর্গা পূজায় ওকে ওর দেশের বাড়ি নিয়ে যাব। ওর শৈশবের সুখের দিনগুলো ওই কটা দিন ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। ওর সুনিশ্চিত ভবিষ্যত গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে নতুন অতিথির সঙ্গে নতুনভাবে আমার পথচলা শুরু হল।

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com