Logo
logo

গল্প / কাহিনী

মহা অষ্টমী

আজ মহালয়া। রাস্তায় প্রতিটা পেন্ডেলে সাজো সাজো রব। ছুটির দিন। বন্ধু সুচেতনার বাড়ি থেকে ফিরছে শর্মিষ্ঠা কেমন যেনো বিমর্ষ দেখাচ্ছে ওকে আর কেমন চার পাশ না খেয়াল করে রাস্তা দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে চলছে। হঠাৎ পেছনের গাড়িটার সাথে প্রায় ধাক্কা লেগে যাচ্ছিলো। গাড়িটার সাথে প্রায় ধাক্কা লেগে যাচ্ছিলো গাড়ির চালক শেষমেশ খুব জোর ব্রেক কষে গাড়িটা থামিয়ে দিলো বাধ্য হয়ে, তারপরে যাচ্ছেতাই ভাবে ওকে শোনালো "রাস্তা দিয়ে ঠিক মতন চলতে পারেননা? মরার খুব শখ হয়েছে বুঝি? সত্যিই জীবনের সামনের পথটা আজ একদম অন্ধকার মনে হচ্ছে শর্মিষ্ঠার। মরে যেতে পারলে বেশ ভালোই হতো হয়তো। সামনের পুজোর জন্য কত প্ল্যান করেছিলো মনে মনে। কিন্তু আজ একটা আঘাতে সব তছনছ হয়ে গেছে ঠিক যেনো স্বপ্নের আয়নার কাঁচটা ভেঙ্গে গেছে। অর্ককে শর্মিষ্ঠা দুই বছর হলো মনে মনে খুব ভালোবাসে। অর্কের সাথে তেমন পরিচয় ছিলোনা। রাস্তাঘাটে দূর থেকে দেখেই ভালোলাগে শর্মিষ্ঠার। তখনও জানতোনা সুচেতনার মাসতুতো দাদা হয় অর্ক। এই দুই মাস আগের ঘটনা, একদিন সুচেতনার বারবার অনুরোধে প্রথম স্কুল থেকে ফেরার পথে সুচেতনার বাড়িতে যায় শর্মিষ্ঠা। সেখানেই মিরাক্কেলি অর্ক সেদিন উপস্থিত হয়। তাই আলাপ ও করিয়ে দেয় সুচেতনা শর্মিষ্ঠাকে অর্কর সাথে। অর্কদার সাথে ভালোই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুই একদিন শর্মিষ্ঠার বাড়িতে গিয়ে। আজকে মহালয়া। তাই ভেবেছিলো সুচেতনার বাড়িতে নিশ্চই অর্ক থাকবে না থাকলেও অসুবিধা নেই। সুচেতনাকে পুজোর সময় অর্ককে তার সাথে দেখা করার কথা বলে আসবে। শর্মিষ্ঠা এই ভেবেই গিয়েছিলো। শর্মিষ্ঠা ভেবেই নিয়েছিলো আর দেরী নয় এবারে ঠিক পুজোর সময় দেখা করে অর্ককে মনের কথা উজাড় করে বলে দেবে। কিন্তু সুচেতনার বাড়িতে গিয়ে আজ শর্মিষ্ঠা যা আঘাত পেলো। এটা ওর কল্পনার অতীত। সুচেতনার বাড়িতে গিয়ে সুচেতনার সাথে গল্প করতে গিয়ে হঠাৎ একগাল হেসে সুচেতনা বললো দেখ তোকে ভাবি বৌদির ছবি দেখাই। দেখ বলে একটা ছবি এগিয়ে দিলো। শর্মিষ্ঠা দেখে অর্ক আর আরেকটা মেয়ের ছবি।
সুচেতনা বললো এ সাথী। অনেকদিন প্ৰেম অর্কদার সাথে। শর্মিষ্ঠা রাস্তা দিয়ে তাই এতো অন্য মনস্ক ভাবে হাঁটছে বাড়ি ফেরার পথে। পুজোর পেন্ডেল গুলোর সাজ দেখে মন বিষাদে ভরে যাচ্ছে ওর। খুব রাগ হলো মা দুর্গার ওপরে ওর। কত প্ল্যান করেছিলো পুজোতে একসাথে অঞ্জলি দেবে। আর কি হলো। মনের দুঃখে পেন্ডেলের সামনে আনমনে বলেই ফেললো মনে মনে "এবারে মা পুজোতে দুঃখেই তো ভরে থাকবে আমার জীবন!এতুমি কি করলে মা!তখনি ওর ফোনটা বেজে উঠলো। হ্যালো বললো ওপাশ থেকে যাকে চাইলো সে অন্য কেউ। সরি রং নম্বর বলে যখনই শর্মিষ্ঠা ফোনটা কেটে দেবে তখনি ঐ পাশ থেকে ঐ সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারিণী মহিলাটি বললো ফোন রেখোনা। তোমার গলা এতো বিমর্ষ শোনাচ্ছে কেনো? শর্মিষ্ঠা কেমন যেনো অভিভূত হয়ে গেলো এতো আপন করা কণ্ঠস্বরে। বললো আমার আজ কিছু ভালোলাগছেনা দিদি। আমার সামনের পথের সব স্বপ্নই তো নষ্ট হয়ে গেলো। আজকে হঠাৎ ঝড়ে। সামনে পুজো আর আমায় একাই কাটাতে হবে। বলে কেমন কেঁদে ফেললো। সুরভি দি বললো সামনে পথ দেখতে পাচ্ছোনা বুঝি তাও কিন্তু পথ আছে কারণ তোমার জীবন এখোনো তোমার সাথেই আছে। ঈশ্বর নিশ্চই চান তুমি তোমার জীবনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাও "শেষ বলে কিছু নেই। যেনো শুরু সেখানেই "।
"তুমি কে?"শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞাসা করে। ওপাশ থেকে উত্তর ভেসে আসে। তুমি আমাকে সুরভি দি বলে ডাকতে পারো। এই নামেই আমাকে ভালোবেসে সবাই ডাকে। এরপরের সুরভিদির কথা গুলো আরও মোটিভেটিভ যা শর্মিষ্ঠা কে জীবনের গ্লানি দূর করে সামনের পথে চলার সাহস যোগায়। বাড়ি ফিরে সামনের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি চালায় শর্মিষ্ঠা। আর রোজ রাতে নিয়ম করে এক সময় সুরভি দির সাথে কথা বলে। সুরভিদির সাথে কথা বলে নতুন করে জীবনে বাঁচার রসদ খুঁজে পায় শর্মিষ্ঠা। সুচেতনার বাড়িতে আর না গেলেও অন্য বন্ধু বান্ধব বেশ গড়ে ওঠে। সুরভি দিই শিখিয়েছে জীবনের সামনের দিকে নতুনকে বরণ করে নিতে। জীবনের প্রতিটা দিন সূর্য উদয় দেখতে পাচ্ছে এতো ঈশ্বরের ই আশীর্বাদ তাই প্রতিটা দিনই ভালোবাসতে হবে নতুন চেতনার সাথে পুরোনো দুঃখের আধারকে দূরে সরিয়ে নতুন সব কিছুর মধ্যেই আনন্দকে খুঁজে নিতে হবে, জীবন যখন আছে সামনে নতুন কাউকে ভালোবাসতেই হবে তবেই তো জীবনের সার্থকতা। সুরভি দি বলে "হারাবার মতন জীবনে তোর যখন আর কিছুই নেই, সবচেয়ে প্ৰিয় মানুষ (অর্ক) কেই যখন হারিয়ে ফেলেছিস চোখের সামনে অন্যর হতে দেখতে হতে পারে সামনের দিনে। তখন আর কিছু হারাবার ভয় নাই বা করলি। পাওয়ার তো তোর অনেক কিছুই আছে। এবারে সামনে শুধু তুই পাবিই ঈশ্বর তুই যা চেয়েছিস তা না দিতে পারলেও তোর যা প্রাপ্য তা তোকে ঠিকই দেবেন। তোর সামনে কোনো ও ভালোমানুষের ভালোবাসা ঈশ্বর যাকে তোর জন্য তুলে রেখেছেন, ঠিক সময়েই সেই মানুষটির ভালোবাসা তুই পাবি ই। সে তার প্রকৃত ভালোবাসা দিয়ে তোর জীবনকে ঠিক ভরিয়ে তুলবে। জীবনে নতুন বিশ্বাসে ভরপুর হয়ে আনন্দের সাথে প্রতিটা দিন কাটাতে আর সামনের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পিপারেশন করতে। দিন গুলি ভালোই কাটছে কিন্তু সুরভি দি কে বার বার দেখার ইচ্ছা কিছুতেই সামলাতে পারছেনা। সুরভি দি কে? কোথায় ই বা থাকে? এতো সুন্দর জীবনী শক্তি যার!শর্মিষ্ঠার তো মাঝে মাঝে মনে হয় দেবী দূর্গা ই যেনো সুরভি দির রূপে ওকে সাহায্য করছে। সুরভি দির বাড়ি কোথায় কিছুই তো বলেনা। বার বার দেখতে চাইলে সুরভি দি এড়িয়ে চলে। তবে একদিন সুরভি দি যে নোয়া পাড়ার দিকেই থাকে তা নোয়া পাড়ার ব্যক্তি গুলোর গল্প বলতে গিয়ে বলে ফেলে। শর্মিষ্ঠা বুদ্ধি করে জেনে ফেলে। সুরভি দিকে দেখতে হবেই। দুর্গার অষ্টমী আজকে। সুরভি দিকে আজকে ঠিক দেখেই ছাড়বে ও। নোয়া পাড়ায় গিয়ে সুরভি বলাতে সবাই কেমন যেনো চিনতে পারছিলোনা। একজন ই বললো বুঝেছি তুমি তোর্ষার কথা বলছো বুঝেছি। এদিকে এসো। একটা বস্তির রাস্তা যার দুদিকে বস্তির ঘর, তার একটা ঘরের সামনে মেয়েটি দাঁড়িয়ে ভেতরে ডাকতে গেলো তোর্ষা তোর্ষা বলে। ঘরের উঠানে চারটি ছেলে মেয়ে খেলছে। খুব গরিব তবে ঠিক যেনো লক্ষী গণেশ কার্তিক আর সরস্বতী। একটি মেয়ে ঠিক যেনো সরস্বতী র মতোই ফর্সা আর ওপর টি ঠিক লক্ষীর মতোই শান্ত স্নিগ্ধ। মেয়েটি বললো সুরভি দি আসতে চাইছেনা তোমার সামনে। তুমি ওকে যে সম্মান করো যদি সে সম্মান আর তার প্রতি তোমার না থাকে, ওনাকে দেখার পরে। এই মেয়েটির নাম বিমলা। মেয়েটি শর্মিষ্ঠা কে বলতে থাকে জানো সুরভি দি বলে যাকে সম্বোধন করছো। ওর ডাকনাম তোর্ষা। এখানে সবাই ঐ নামেই চেনে। তবে সুরভি দি খুব ভালো পড়াশোনা তে ছিলো। শুনেছি কি ভালোবেসে বিয়ের পরে এখানে আসে মিথ্যা কথা বলে ঠকিয়ে স্বামী বিয়ে করলেও হিন্দু ঘরের সতীসাদ্ধি মেয়ে তাই এখানেই কষ্ট করে ঘর করেছে। স্বামী রোজগার করতো। ভালো সুখেই ছিলো। কিন্তু চার ছেলেমেয়ের পরে হঠাৎ স্বামী অন্য কোনো মেয়েকে ভালোবেসে ওকে তাড়িয়ে দেয়। কোনো ও মেয়েকে ভালোবেসে এখান থেকে পালিয়ে চলে যায়। আর ফেরেনি। কিন্তু চার ছেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মরতে পারেনি। চাকরির চেষ্টা করেছে। প্রাইভেট জবের ম্যানেজার যখন শরীর নষ্ট করতে গেছিলো তখন মোটা মাইনের চাকরি মুখের ওপরে ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছিলো সেই মুহূর্তে ই সতীস্বাদ্ধি সুরভি দি। সৎপথে এখন এখানে ভাড়া থেকে চার ছেলে মেয়েকে এখানে মানুষ করতে কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পয়সা, প্রতিপত্তি কিছুই নেই তাই স্বামীর কাছে কোনো অধিকার ই চাইতে পারেনি। সৎপথে এখন লোকের বাড়ি কাজ করে আর রুগীদের সেবা করে উপার্জন করে সংসার চালায়। ছেলেমেয়েদের মুখে সৎ পথে আয়ের অন্ন তুলে দেয়। তবু চাকরির বদলে শরীর বিকিয়ে দেয়নি। সরকারি চাকরি চেষ্টার বয়স চলে গেছে। নইলে শিক্ষিত সুরভি দি তাও চেষ্টা করতো। সুরভি দি জানো শুধু তোমাকে নয়, অনেক অসহায় মেয়ে যারা আত্মহত্যা করতে গেছিলো। তাদের জীবনে নতুন স্বাদ এনে দিয়েছে। তবু ভয় পায় যদি সুরভি দির বাস্তব জানলে ওকে তোমরা যে সন্মান দিয়েছো তা আর না করো। যদি নীচু মনে করে অসম্মান করো, অপমান করো।শর্মিষ্ঠা হেসে সুরভি দির ঘরে ঢুকে যায় গিয়ে বলে -"মা দুর্গার অষ্টমী আজ আর যে মা তার সন্তানের সুখের জন্য কষ্ট করে সৎ পথে পরিশ্রম করে খাদ্য জোগাড় করছে, অসুস্থ কিছু মানুষের সেবা করছে। কিছু কম বয়সী মেয়ে যাদের জীবনে আত্মহত্যা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকেনা, তাদের সুপথ দেখাচ্ছে। সেই মাকে সেই মানুষকে আমি অসম্মান করবো এটা ভাবলে কি করে দিদি। মা দূর্গা তো সকল মায়ের মধ্যেই বিরাজমান। আমি তো এই দূর্গা পূজা অবধি হয়তো বাঁচতামও না।
নিজেকে শেষ করে দিতাম। তুমি ই আমাকে নবজন্ম দিয়েছো। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দিয়েছো। আমার কাছে তো তুমি দেবী দূর্গারই প্রতিভূ বলে সুরভি দিকে প্রণাম করে শর্মিষ্ঠা। এই সম্মানে সুরভি দির চোখ জলে ভরে যা।

<<Prev1234Next>>

Contact US

Tel: 9903329047 / 8697419047
Email: sreemotirdarbar@gmail.com